০৭:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

সাবরিনা হুসেন মিষ্টির গল্প : চাহিদা

ছবি: সাবরিনা হুসেন মিষ্টি।


মোবাইল ফোনের রিংটোন সাইলেন্ট করা, তারপরও ভাইব্রেশন এর কারনে একটা অসহ্য ভো ভো শব্দ করেই চলেছে ! ফোনের দিকে না তাকিয়েও মাহি বুঝতে পারছে সুমন ফোন করেছে ! একমাত্র সুমনই ফোন না ধরা পর্যন্ত নিরলসভাবে কল করেই যাবে ! ফোন ধরে করল্লার মতো তেতো কিছু কথা ক্যাটক্যাট করে না শোনানো পর্যন্ত এই ক্লান্তিকর ভো ভো শব্দটা থেকে নিস্তার নেই ! আজ মাহি’র সেটাও করার ইচ্ছে হচ্ছে না, ক্লান্ত লাগছে- কাল রাতে প্রচুর ধকল গিয়েছে !

মাহি নামটা অবশ্য তার আকিকা করে রাখা নাম নয় – তার সার্টিফিকেটের নাম মেহেরুননেসা খাতুন! মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় পড়াশোনা করতে আসার পাঁচ মাসের মধ্যে কালো চুলে হাইলাইটস হয়েছে, জবরজং ঢলঢলে সালোয়ার কামিজ হয়েছে ওয়েস্টার্ন আউটফিট, মোটা জোড়া ভ্রু বিউটি সেলুনের বদান্যতায় সরু থেকে সরুতর হয়েছে ! দাঁতে কাটা ছোট নখ লম্বা আর নেলপলিশরঞ্জিত হয়েছে! অনলাইন থেকে কেনা বিদেশী ওয়াটেনিং ক্রিমের বহুল ব্যবহারে অল্প সময়েই চেহারায় জৌলুশ এসেছে ! সেই সাথে মেহেরুননেসা খাতুন হয়েছে মেহের মাহি !

উফ !! অসহ্য ভো ভো শব্দ মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে ! ভাইব্রেশনটা চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারছেনা ! ফোনটা গেল সপ্তাহে আফজাল কিনে দিয়েছে! দাম নিয়েছে প্রায় সাড়ে এক লাখ ! মাহি’র বাবা আর বড় দুই ভাই জর্ডানে নির্মান শ্রমিক হিসেবে বহুদিন প্রবাসী – আয়রোজগার মন্দ নয় ; তারপরও তাদের চৌদ্দ গুষটির মধ্যেও কেউ কোনদিন আইফোন ব্যবহার করেনি ! এটার কারিগরি বুঝতে সময় লাগবে !

ফোন করার ব্যাপারে সুমনের ধৈর্য রবার্ট ব্রুসকেও হার মানায় ! প্রথমদিনেই মাহি এটা বুঝে গিয়েছিল ! ইউভারসিটিতে যেদিন ভর্তি হতে আসে সেদিনই সুমনের সাথে দেখা ! কিছু বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো ছেলে আছে যারা সর্বদা নিজের কাজ বাদ দিয়ে পরের আজাইরা কাজ নিয়ে ব্যাতিব্যস্ত থাকে ! সুমন তাঁদেরই একজন ! একই সাবজেক্ট এ তিন সেমিসটার উপরে পড়ে ! তালপাতার সেপাই এর মতো ঢ্যংগা, গায়ে তিন ছটাকও মাংস নেই ! মাথায় বাবরি চুল! গালের দাড়ি ফ্যাশন করে রাখা নাকি অযত্ন অবহেলায় বেড়ে ওঠা তা ঠাহর করা যাচ্ছেনা! অপরিচিত মুখে পরিচিতের হাসি!

ইতিমধ্যেই তিনজন নতুন ছাত্র ছাত্রীর ভর্তির কাগজপত্র নিয়ে অযথাই ছোটাছুটি করছে ! একরকম জোড় করেই মাহির হাত থেকে কাগজগুলো নিয়েছিলো সে ! “তুমি ফ্যানের নিচে ঠান্ডা হঁযে বসো- আমি ব্যবস্থা করছি “ অচেনা একটি ছেলের কাছে সার্টিফিকেটের মূল কপি তুলে দিতে একটু দ্বিধা হচ্ছিল বটে ,কিন্তু আজ ভর্তির শেষ দিন বলে প্রচন্ড সিরিয়াল !সেদিকে তাকিয়ে মাহি বলল,”আচছা আমি বসছি,আপনার ফোন নম্বরটা দিন-দেরী হলে ফোন দিব” ফোন নম্বর বিনিময়ে করে সুমন অফিস ঘরের দিকে ছুটে গেল! সেই ফোন নম্বর দেয়াই কাল হলো -, এরপর থেকে কারনে এবং বেশিরভাগ সময়ই অকারনে ফোন করে সুমন তার জীবনটা ত্যানাত্যানা করে ফেলেছে !

গাউছিয়া মার্কেট এর ঠেসাঠেসি ভীড়ের মধ্যে যেখানে ব্যাগ সামলানোই দায় এবং ব্যাগ থেকে ফোন বের করাই বিপদজ্জনক,শুধু টাকা বা মোবাইল হ্যাঁচকা টানে নিয়ে যাবে সেজন্য নয় , মোবাইলে কথা বলার সামান্য অন্যমনস্কতা সুযোগে ওঁত পেতে থাকা লোভী পুরুষ বুকে বা কোমরে হাত দেবে ! এর মধ্যেও সুমন কল করতেই থাকবে ! রিসিভ না করা পর্যন্ত থামাথামি নাই !
“পাঠাও” বাইকে চড়ে নিজের ব্যাগ আর পাঠাও চালকের পিঠের সাথে নিজের বুকের ছোঁয়া যথাসাধ্য সামলে বসে থাকাই যেখানে বড় চ্যালেনজ সেই সময়ও সুমন ফোন করতেই থাকবে ! এক সেকেন্ডও বিরতি দেবে না !

মাহি ফোন অফ করেও রাখতে পারেনা কারন, আফজাল ফোন অফ করা পছন্দ করেনা ! সন্দেহ করে ! শুধু যখন আফজালের সাথে থাকে ঐ সময়টুকু সে আফজালের অগোচরে ফোনটা অফ করে রাখে !


পর্ব- ১


 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

জাতীয় পুনর্গঠন কৌশল (National Reconstruction Strategies)

সাবরিনা হুসেন মিষ্টির গল্প : চাহিদা

প্রকাশিত : ১২:৩৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ মে ২০২৪

মোবাইল ফোনের রিংটোন সাইলেন্ট করা, তারপরও ভাইব্রেশন এর কারনে একটা অসহ্য ভো ভো শব্দ করেই চলেছে ! ফোনের দিকে না তাকিয়েও মাহি বুঝতে পারছে সুমন ফোন করেছে ! একমাত্র সুমনই ফোন না ধরা পর্যন্ত নিরলসভাবে কল করেই যাবে ! ফোন ধরে করল্লার মতো তেতো কিছু কথা ক্যাটক্যাট করে না শোনানো পর্যন্ত এই ক্লান্তিকর ভো ভো শব্দটা থেকে নিস্তার নেই ! আজ মাহি’র সেটাও করার ইচ্ছে হচ্ছে না, ক্লান্ত লাগছে- কাল রাতে প্রচুর ধকল গিয়েছে !

মাহি নামটা অবশ্য তার আকিকা করে রাখা নাম নয় – তার সার্টিফিকেটের নাম মেহেরুননেসা খাতুন! মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় পড়াশোনা করতে আসার পাঁচ মাসের মধ্যে কালো চুলে হাইলাইটস হয়েছে, জবরজং ঢলঢলে সালোয়ার কামিজ হয়েছে ওয়েস্টার্ন আউটফিট, মোটা জোড়া ভ্রু বিউটি সেলুনের বদান্যতায় সরু থেকে সরুতর হয়েছে ! দাঁতে কাটা ছোট নখ লম্বা আর নেলপলিশরঞ্জিত হয়েছে! অনলাইন থেকে কেনা বিদেশী ওয়াটেনিং ক্রিমের বহুল ব্যবহারে অল্প সময়েই চেহারায় জৌলুশ এসেছে ! সেই সাথে মেহেরুননেসা খাতুন হয়েছে মেহের মাহি !

উফ !! অসহ্য ভো ভো শব্দ মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে ! ভাইব্রেশনটা চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারছেনা ! ফোনটা গেল সপ্তাহে আফজাল কিনে দিয়েছে! দাম নিয়েছে প্রায় সাড়ে এক লাখ ! মাহি’র বাবা আর বড় দুই ভাই জর্ডানে নির্মান শ্রমিক হিসেবে বহুদিন প্রবাসী – আয়রোজগার মন্দ নয় ; তারপরও তাদের চৌদ্দ গুষটির মধ্যেও কেউ কোনদিন আইফোন ব্যবহার করেনি ! এটার কারিগরি বুঝতে সময় লাগবে !

ফোন করার ব্যাপারে সুমনের ধৈর্য রবার্ট ব্রুসকেও হার মানায় ! প্রথমদিনেই মাহি এটা বুঝে গিয়েছিল ! ইউভারসিটিতে যেদিন ভর্তি হতে আসে সেদিনই সুমনের সাথে দেখা ! কিছু বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো ছেলে আছে যারা সর্বদা নিজের কাজ বাদ দিয়ে পরের আজাইরা কাজ নিয়ে ব্যাতিব্যস্ত থাকে ! সুমন তাঁদেরই একজন ! একই সাবজেক্ট এ তিন সেমিসটার উপরে পড়ে ! তালপাতার সেপাই এর মতো ঢ্যংগা, গায়ে তিন ছটাকও মাংস নেই ! মাথায় বাবরি চুল! গালের দাড়ি ফ্যাশন করে রাখা নাকি অযত্ন অবহেলায় বেড়ে ওঠা তা ঠাহর করা যাচ্ছেনা! অপরিচিত মুখে পরিচিতের হাসি!

ইতিমধ্যেই তিনজন নতুন ছাত্র ছাত্রীর ভর্তির কাগজপত্র নিয়ে অযথাই ছোটাছুটি করছে ! একরকম জোড় করেই মাহির হাত থেকে কাগজগুলো নিয়েছিলো সে ! “তুমি ফ্যানের নিচে ঠান্ডা হঁযে বসো- আমি ব্যবস্থা করছি “ অচেনা একটি ছেলের কাছে সার্টিফিকেটের মূল কপি তুলে দিতে একটু দ্বিধা হচ্ছিল বটে ,কিন্তু আজ ভর্তির শেষ দিন বলে প্রচন্ড সিরিয়াল !সেদিকে তাকিয়ে মাহি বলল,”আচছা আমি বসছি,আপনার ফোন নম্বরটা দিন-দেরী হলে ফোন দিব” ফোন নম্বর বিনিময়ে করে সুমন অফিস ঘরের দিকে ছুটে গেল! সেই ফোন নম্বর দেয়াই কাল হলো -, এরপর থেকে কারনে এবং বেশিরভাগ সময়ই অকারনে ফোন করে সুমন তার জীবনটা ত্যানাত্যানা করে ফেলেছে !

গাউছিয়া মার্কেট এর ঠেসাঠেসি ভীড়ের মধ্যে যেখানে ব্যাগ সামলানোই দায় এবং ব্যাগ থেকে ফোন বের করাই বিপদজ্জনক,শুধু টাকা বা মোবাইল হ্যাঁচকা টানে নিয়ে যাবে সেজন্য নয় , মোবাইলে কথা বলার সামান্য অন্যমনস্কতা সুযোগে ওঁত পেতে থাকা লোভী পুরুষ বুকে বা কোমরে হাত দেবে ! এর মধ্যেও সুমন কল করতেই থাকবে ! রিসিভ না করা পর্যন্ত থামাথামি নাই !
“পাঠাও” বাইকে চড়ে নিজের ব্যাগ আর পাঠাও চালকের পিঠের সাথে নিজের বুকের ছোঁয়া যথাসাধ্য সামলে বসে থাকাই যেখানে বড় চ্যালেনজ সেই সময়ও সুমন ফোন করতেই থাকবে ! এক সেকেন্ডও বিরতি দেবে না !

মাহি ফোন অফ করেও রাখতে পারেনা কারন, আফজাল ফোন অফ করা পছন্দ করেনা ! সন্দেহ করে ! শুধু যখন আফজালের সাথে থাকে ঐ সময়টুকু সে আফজালের অগোচরে ফোনটা অফ করে রাখে !


পর্ব- ১