০৬:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

ছোটগল্প : চাহিদা

ছবি: সাবরিনা হুসেন মিষ্টি


বিকেলের দিকে দুজন দুটো উবার নিয়ে যে যার গন্তব্যে পৌছায়। মাহি সবে গোসল করে বের হয়ে চা বানিয়ে খাচ্ছে এমন সময় কলিং বেল, আজব! কে আসবে? ছুটা বুয়া তো সকালেই কাজ সেরে চলে যায় ! তার কাছে আলাদা চাবি দেয়া আছে !

দরজা খুলে মাহি অবাক ! মা আর তের বছর বয়সী ছোট ভাই! মাহির মা আনজুআরা বেগম ঘরে ঢুকে বোরখা খুলতে খুলতে জানান, মাহির ছোট মামা কাতার গেছেন – তাকে এয়ার পোর্টে তুলে দিতেই এসেছেন !

আনজুআরা বেগমের ওজন একশ কেজি – চারতলায় উঠতে হাসফাস করছেন ! সারাক্ষন যারা পান চিবান তাদের সাধারনত অন্য খাবারের প্রতি রুচি কম থাকে ! আনজুআরা বেগম এর ব্যতিক্রম ! কোন খাবার বিশেষ করে মিষ্টি দেখলেই থু: করে পানটা ফেলে টপাটপ দু’তিনটা মিষটি মুখে ঠেসে দেন, তারপর আবার একটা জর্দা সহ পান মুখের মধ্যে ঠেসে দেন ! তার হাই প্রেসার আছে, ডায়াবেটিস আছে তারপরও জিহ্বার উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নাই ! শরীর খুব খারাপ লাগলে ঢকঢক করে তেতুলের সরবত খান কিন্তু ঔষধ জীবনে খান না ! ছেলেমেয়েরা ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ কিনে দিয়েছে – সেগুলো মাঝে মাঝে দেখেন ও অনাবিল পরিতৃপ্তি লাভ করেন!

আনজুআরা আগেও এই বাসায় একবার এসেছেন – তখন ফারনিচার ছিলনা ! এখন সাজানো গোছানো বাসা দেখে তিনি মুগ্ধ হন ! বাসা থেকে মেয়েকে যে টাকা পাঠানো হয় সেই টাকায় এই বিলাসিতা সম্ভব নয় ! আনজুআরাকে মাহি আগেই বলে রেখেছে সে একটি বেসরকারি অফিসে পার্ট টাইম চাকরী করে! আনজুআরা অতশত বোঝে না ! মেয়ে সুখে থাকলেই তিনি সুখী।

রাতে মাহি কাচচি বিরিয়ানী নিয়ে আসে! আনজুআরা এই এলাকার বিরিয়ানী অত্যাধিক পছন্দ করেন ।অনেকক্ষন ধরে বিরিয়ানীর খাসির হাড় চুষে চুষে খান ! এক প্যাকেটের জায়গায় সাড়ে এক প্যাকেট খেয়ে ফেলেন- মাহি মানা করতে গিয়েও করেনা !

বিরিয়ানী রোসট খেয়ে বিশাল সাইজের জর্দা দেয়া পান মুখে দিয়ে শুতে যান আনজুআরা ! রাত দুটা থেকে কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে থাকে তার ! গতবার ডাক্তারনি পরীক্ষা করে বলছিলো – পিত্তথলিতে পাথর! যদিও আনজুআরা এইসব ডাক্তারদের কথা জীবনেও গুরুত্ব দেন না -এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেন!

বুকের চাপ ধরা ব্যথাটা ক্রমশ বাড়ছে – পাশেই ছেলে অঘোরে ঘুমাচ্ছে ! পাশের রুমে অবশ্য মাহি জেগেই ছিলো ! ফেসবুকে এটা সেটা দেখছিলো ! হঠাৎ মায়ের গোংগানির শব্দ শোনে ! দৌড়ে পাশের ঘরে এসে দেখে আনজুআরা বেগম এক হাতে বুক চেপে ধরে ছটফট করছেন – পেশাব করে বিছানা ভিজিয়ে ফেলেছেন ! এমন দৃশ্য কল্পনার বাইরে ! থরথর করে কেঁপে উঠে মাহি ! জ্ঞান হওয়া অবধি এমন দৃশ্য কখনও দেখেনি মাহি ! এক হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে আরেক হাত তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে আফজালকে ফোন করে ! ক্রমাগত রিং হবার পর মাহি যখন ফোন কেটে দিতে যাবে তখন হঠাৎ আফজাল ফোনটা রিসিভ করে , কঠিন কন্ঠে বলে, “তুমি জানো না, রাতে কল দেয়া নিষেধ ??? কোন সাহসে রাত তিনটায় কল দাও তুমি !?”

মাহি স্তব্ধ হয়ে যায় ! হঠাৎ নিজের উপরই প্রচন্ড ঘৃণা হয় তার ! চাহিদার টানে কার সাথে মিশেছে এতদিন? সে তো শুধু সমভোগের পুতুল নয়, চাহিদা চরিতার্থের মেশিন নয় – সে একটা রক্তমাংসের মানুষ যার ব্যক্তিগত একটা জীবন আছে ! সেই জীবনে কষ্ট , বেদনা, অপ্রাপ্তি আর সমস্যা সমঝোতা আছে !

মাহি সুমনকে ফোন দেয় – কাঁপা কাঁপা কান্না জড়িত কন্ঠে একবার শুধু বলে -সুমন ….আম্মা …!

এরপর আর মাহির কিছু মনে নেই !
এমবুলেনস নিয়ে এসে অতি দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, সিসিইউ তে ভর্তি করা , ঔষধপত্র কিনে দেয়া এগুলো নিয়ে ভাবতে হয়নি মাহিকে ! শুধু অবশ শরীরে অবসন্ন মনে হাসপাতালের বারানদায় পা ছড়িয়ে বসে থেকেছে আর আকাশ পাতাল ভেবেছে ! মাহির ছোট ভাইটাও ভয়ে কাছে ঘেষেনি- সুমনের সাথেই ঘুরঘুর করেছে।

হৃদরোগ হাসপাতালে কেবিন পাওয়া দুরূহ ! তারপরও কেমন করে যেন সুমন সেই ব্যবস্থা করে ফেলেছে! পাঁচ দিনের দিন যখন সিসিইউ থেকে আনজুআরা বেগমকে কেবিনে নেয়া হবে -তখন হঠাৎ মাহির ফোন বেজে উঠে ! আফজাল ! এই প্রথম মাহি তার ফোন ধরার কোন তাগিদ অনুভব করেনা ! এই প্রথম সম্পর্কটা অন্তসার শূন্য মনে হয় !

কেবিনে নেয়ার পর সুমন অক্সিজেন মাস্ক টা ঠিক করে ঘুরে দাঁড়াতেই মাহি হঠাৎ জড়িয়ে ধরে তাকে ! জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে ! এই পাঁচদিন যে মাহি এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলেনি সেই মাহি কাঁদতে কাঁদতে সুমনের শার্টের বুকের কাছটা ভিজিয়ে দেয়!

বিলাসিতায় ভরপুর জীবনটাই মূল চাহিদা নয় , শারিরীক মিলনের চাহিদাটাই বড় নয় !!

কোন কোন সময় কাউকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে পারার অধিকার পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় চাহিদা ! কোন এক রৌদ্র উজ্জ্বল দিনে রিক্সায় হুড তুলে কারও হাতে হাত রেখে সুখ দুখের গল্প করতে রিকসায় ঘুরতে পারাটাই চাহিদা ! রাত দুপুরে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি শুরু হলে একটি প্রেমের টেকসট পাওয়াটাই জীবনের অনেক বড় চাহিদা !
মাহি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সুমনকে ! এমন এক নির্ভরতার বাহুডোর যা কোনদিন ছিন্ন হবার মতো না।


 

জনপ্রিয়

জাতীয় পুনর্গঠন কৌশল (National Reconstruction Strategies)

ছোটগল্প : চাহিদা

প্রকাশিত : ১২:৩০:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই ২০২৪

বিকেলের দিকে দুজন দুটো উবার নিয়ে যে যার গন্তব্যে পৌছায়। মাহি সবে গোসল করে বের হয়ে চা বানিয়ে খাচ্ছে এমন সময় কলিং বেল, আজব! কে আসবে? ছুটা বুয়া তো সকালেই কাজ সেরে চলে যায় ! তার কাছে আলাদা চাবি দেয়া আছে !

দরজা খুলে মাহি অবাক ! মা আর তের বছর বয়সী ছোট ভাই! মাহির মা আনজুআরা বেগম ঘরে ঢুকে বোরখা খুলতে খুলতে জানান, মাহির ছোট মামা কাতার গেছেন – তাকে এয়ার পোর্টে তুলে দিতেই এসেছেন !

আনজুআরা বেগমের ওজন একশ কেজি – চারতলায় উঠতে হাসফাস করছেন ! সারাক্ষন যারা পান চিবান তাদের সাধারনত অন্য খাবারের প্রতি রুচি কম থাকে ! আনজুআরা বেগম এর ব্যতিক্রম ! কোন খাবার বিশেষ করে মিষ্টি দেখলেই থু: করে পানটা ফেলে টপাটপ দু’তিনটা মিষটি মুখে ঠেসে দেন, তারপর আবার একটা জর্দা সহ পান মুখের মধ্যে ঠেসে দেন ! তার হাই প্রেসার আছে, ডায়াবেটিস আছে তারপরও জিহ্বার উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নাই ! শরীর খুব খারাপ লাগলে ঢকঢক করে তেতুলের সরবত খান কিন্তু ঔষধ জীবনে খান না ! ছেলেমেয়েরা ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ কিনে দিয়েছে – সেগুলো মাঝে মাঝে দেখেন ও অনাবিল পরিতৃপ্তি লাভ করেন!

আনজুআরা আগেও এই বাসায় একবার এসেছেন – তখন ফারনিচার ছিলনা ! এখন সাজানো গোছানো বাসা দেখে তিনি মুগ্ধ হন ! বাসা থেকে মেয়েকে যে টাকা পাঠানো হয় সেই টাকায় এই বিলাসিতা সম্ভব নয় ! আনজুআরাকে মাহি আগেই বলে রেখেছে সে একটি বেসরকারি অফিসে পার্ট টাইম চাকরী করে! আনজুআরা অতশত বোঝে না ! মেয়ে সুখে থাকলেই তিনি সুখী।

রাতে মাহি কাচচি বিরিয়ানী নিয়ে আসে! আনজুআরা এই এলাকার বিরিয়ানী অত্যাধিক পছন্দ করেন ।অনেকক্ষন ধরে বিরিয়ানীর খাসির হাড় চুষে চুষে খান ! এক প্যাকেটের জায়গায় সাড়ে এক প্যাকেট খেয়ে ফেলেন- মাহি মানা করতে গিয়েও করেনা !

বিরিয়ানী রোসট খেয়ে বিশাল সাইজের জর্দা দেয়া পান মুখে দিয়ে শুতে যান আনজুআরা ! রাত দুটা থেকে কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে থাকে তার ! গতবার ডাক্তারনি পরীক্ষা করে বলছিলো – পিত্তথলিতে পাথর! যদিও আনজুআরা এইসব ডাক্তারদের কথা জীবনেও গুরুত্ব দেন না -এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেন!

বুকের চাপ ধরা ব্যথাটা ক্রমশ বাড়ছে – পাশেই ছেলে অঘোরে ঘুমাচ্ছে ! পাশের রুমে অবশ্য মাহি জেগেই ছিলো ! ফেসবুকে এটা সেটা দেখছিলো ! হঠাৎ মায়ের গোংগানির শব্দ শোনে ! দৌড়ে পাশের ঘরে এসে দেখে আনজুআরা বেগম এক হাতে বুক চেপে ধরে ছটফট করছেন – পেশাব করে বিছানা ভিজিয়ে ফেলেছেন ! এমন দৃশ্য কল্পনার বাইরে ! থরথর করে কেঁপে উঠে মাহি ! জ্ঞান হওয়া অবধি এমন দৃশ্য কখনও দেখেনি মাহি ! এক হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে আরেক হাত তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে আফজালকে ফোন করে ! ক্রমাগত রিং হবার পর মাহি যখন ফোন কেটে দিতে যাবে তখন হঠাৎ আফজাল ফোনটা রিসিভ করে , কঠিন কন্ঠে বলে, “তুমি জানো না, রাতে কল দেয়া নিষেধ ??? কোন সাহসে রাত তিনটায় কল দাও তুমি !?”

মাহি স্তব্ধ হয়ে যায় ! হঠাৎ নিজের উপরই প্রচন্ড ঘৃণা হয় তার ! চাহিদার টানে কার সাথে মিশেছে এতদিন? সে তো শুধু সমভোগের পুতুল নয়, চাহিদা চরিতার্থের মেশিন নয় – সে একটা রক্তমাংসের মানুষ যার ব্যক্তিগত একটা জীবন আছে ! সেই জীবনে কষ্ট , বেদনা, অপ্রাপ্তি আর সমস্যা সমঝোতা আছে !

মাহি সুমনকে ফোন দেয় – কাঁপা কাঁপা কান্না জড়িত কন্ঠে একবার শুধু বলে -সুমন ….আম্মা …!

এরপর আর মাহির কিছু মনে নেই !
এমবুলেনস নিয়ে এসে অতি দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, সিসিইউ তে ভর্তি করা , ঔষধপত্র কিনে দেয়া এগুলো নিয়ে ভাবতে হয়নি মাহিকে ! শুধু অবশ শরীরে অবসন্ন মনে হাসপাতালের বারানদায় পা ছড়িয়ে বসে থেকেছে আর আকাশ পাতাল ভেবেছে ! মাহির ছোট ভাইটাও ভয়ে কাছে ঘেষেনি- সুমনের সাথেই ঘুরঘুর করেছে।

হৃদরোগ হাসপাতালে কেবিন পাওয়া দুরূহ ! তারপরও কেমন করে যেন সুমন সেই ব্যবস্থা করে ফেলেছে! পাঁচ দিনের দিন যখন সিসিইউ থেকে আনজুআরা বেগমকে কেবিনে নেয়া হবে -তখন হঠাৎ মাহির ফোন বেজে উঠে ! আফজাল ! এই প্রথম মাহি তার ফোন ধরার কোন তাগিদ অনুভব করেনা ! এই প্রথম সম্পর্কটা অন্তসার শূন্য মনে হয় !

কেবিনে নেয়ার পর সুমন অক্সিজেন মাস্ক টা ঠিক করে ঘুরে দাঁড়াতেই মাহি হঠাৎ জড়িয়ে ধরে তাকে ! জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে ! এই পাঁচদিন যে মাহি এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলেনি সেই মাহি কাঁদতে কাঁদতে সুমনের শার্টের বুকের কাছটা ভিজিয়ে দেয়!

বিলাসিতায় ভরপুর জীবনটাই মূল চাহিদা নয় , শারিরীক মিলনের চাহিদাটাই বড় নয় !!

কোন কোন সময় কাউকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে পারার অধিকার পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় চাহিদা ! কোন এক রৌদ্র উজ্জ্বল দিনে রিক্সায় হুড তুলে কারও হাতে হাত রেখে সুখ দুখের গল্প করতে রিকসায় ঘুরতে পারাটাই চাহিদা ! রাত দুপুরে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি শুরু হলে একটি প্রেমের টেকসট পাওয়াটাই জীবনের অনেক বড় চাহিদা !
মাহি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সুমনকে ! এমন এক নির্ভরতার বাহুডোর যা কোনদিন ছিন্ন হবার মতো না।