একটি দেশের স্বাধীনতা কিংবা মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় একদিনে অর্জিত হয় না। এটি মূলতঃ কোনো ভূখণ্ডের সকল কিংবা অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ দিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও ত্যাগের ফসল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কিংবা বিজয় অর্জনের প্রেক্ষাপটও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। আর এটাই স্বাভাবিক।
একই সঙ্গে স্বাধীনতার পরিপূর্ন স্বাদ আস্বাদনের জন্য দরকার জনগনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি দেশী ও বিদেশী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র এবং জনগনের পূর্ন সার্বভৌমত্ব, অর্থাৎ ভোট ও ভাতের ন্যায্য অধিকার এবং জাতীয় সংহতি। তা না হলে অর্জিত স্বাধীনতা কখনই অর্থবহ হয় না। অর্থনৈতিক মুক্তি মানে হলো মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রকৃত নিশ্চয়তা, যেগুলো হচ্ছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। অন্যদিকে রাজনৈতিক মুক্তি হচ্ছে পরিপূর্নভাবে বিকশিত গণতান্ত্রিক পরিবেশে মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা, অবাধ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনী পরিবেশে জনগনের সুষ্ঠু ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং প্রতিপক্ষের প্রতি পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহানুভূতির অনুশীলন। মুলত এটাই গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার। আর সেটা না হলে স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণটি আমজনতার নাগালের বাইরেই রয়ে যায়।
আর এভাবেই স্বাধীনতা অর্জনের স্বাভাবিক পথ ধরে ভারত বর্ষে শুরু হয় আন্দোলন সংগ্রামের বজ্রনিনাদ ও বেজে ওঠে একের পর এক যুদ্ধের ডামাডোল যার ফলশ্রুতিতে ১৯০৫ সালে ঘটে বঙ্গভঙ্গ এবং এর সুফল ভোগের প্রারম্ভেই ১৯১১ সালে হয় বঙ্গভঙ্গ রদ। কিন্তু সংগ্রামী জনতাকে সাথে নিয়ে দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দ সামনে এগোতে থাকে। মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। এই পথ ধরেই ১৯৪০ সালের ২৩ শে মার্চ শেরে-ই-বাংলা কর্তৃক বৃটিশ ভারতের লাহোরে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব, অতঃপর স্বাধীন পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক পূর্ব পাকিস্তানে মাতৃভাষার দাবীতে ‘৫২ এর ২১ শে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার তথা স্বায়ত্ব শাসন আদায়ের জন্য ‘৬৬ এর ৭ই জুনের ছয় দফা প্রস্তাবনা ও ‘৬৯ এর জানুয়ারীর স্বতঃস্ফুর্ত গণঅভ্যুথাণ, ‘৭১ এর ৭ ই মার্চের ভাষণে মুক্তি সংগ্রামের ডাক, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আনুষ্ঠানিক পাঠ [যা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্য্যমন্ডিত] ও একই সাথে মহান মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ও ২৫ শে মার্চের গণহত্যাকারী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতার আহবান, মুজিবনগর সরকারের সফল কুটনৈতিক পদচারনা, সেক্টর কমান্ডারগনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে যুদ্ধ পরিচালনা এবং সব শেষে দীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সামরিক-বেসামরিক সকল দেশপ্রেমিক জনগনের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মত্যাগ ও মুক্তি সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত হয় লাল সবুজের পতাকাতলে উদিত ও বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা স্বাধীন সার্বভৌম এই বাংলাদেশ, আমার প্রিয় জন্মভুমি সোনার বাংলা।
দুই লাখ বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমহানিসহ এভাবে যাদের নির্ভেজাল ও আন্তরিক ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই বিরাট অর্জন বিজয় দিবসের প্রাক্কালে তাদের সকলের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম ও আন্তরিক ভালবাসা এবং সকল শহীদ ও কবরবাসী দেশপ্রেমিকের আত্মার মাগফিরাত কামনায় রইল মহান আল্লাহর দরবারে দোয়ার আবেদন। পাশাপাশি এবারের বিজয় দিবসের মূল শ্লোগান হোক “বিকশিত গণতান্ত্রিক পরিবেশে স্বাধীনতার পরিপূর্ন আস্বাদন”।
আস সালামু আলাইকুম।
মো: এরশাদ হালিম, পি. এইচ. ডি.
শিক্ষক ও গবেষক
অরগানিক সিন্থেসিস ও কম্পোজিট মেটেরিয়ালস
রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 














