১১:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
দুদকের তদন্ত চলাকালেই ঢাকার জেলা প্রশাসক পদে পদায়ন; সিন্ডিকেটের প্রভাব, তড়িঘড়ি দায়িত্ব হস্তান্তর ও ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সরকার

ঢাকার ডিসি পদে ফরিদা খানম: নিয়োগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড়

নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই একের পর এক সমালোচনা ও বিতর্কে জড়াচ্ছে। এবং এ ধরনের প্রায় প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সেই একই শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরাসরিভাবে জড়িত রয়েছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সর্বশেষ, ঢাকার জেলা প্রশাসক পদে বহুল আলোচিত, বিতর্কিত, শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ফরিদা খানমের নিয়োগ নিয়ে এখন ব্যাপক তোলপাড় চলছে। চট্টগ্রামের ডিসি থাকাকালের ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তও চলছিল। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে ফরিদা খানমের গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং দুদকের পক্ষ থেকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের কাজও শুরু করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার মধ্যেই তাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পদ, ঢাকার ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান সময়ের আলোচিত দুর্নীতিবাজ এই নারী কর্মকর্তাকে ঢাকার ডিসি পদে নিয়োগে প্রভাব খাটিয়েছে ওই একই সিন্ডিকেট।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এ-সংক্রান্ত সঠিক তথ্য তুলে ধরা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে রাজি করানো হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে সিন্ডিকেটের ৩০ কোটি টাকার লেনদেন। সিন্ডিকেটে রয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রীর পিএস মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী। এছাড়া বহুল আলোচিত ও ‘সুপার পাওয়ারফুল’ বলে পরিচিত স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী তো রয়েছেনই। এই সিন্ডিকেটেরই একজনের আপন মেয়ের জামাই, জুডিশিয়াল ক্যাডারের সদস্য, বর্তমানে যিনি আইন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে আছেন—তার মাধ্যমেই এই টাকার লেনদেন হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে ঢাকার ডিসির দায়িত্বভার হস্তান্তর নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। ফরিদা খানমকে ঢাকার ডিসি পদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য মাত্র দুই ঘণ্টা সময় হাতে পেয়েছেন কর্মরত ডিসি রেজাউল করিম। যদিও তাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদায়নের ঘটনাটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ এবং এতে স্ট্যান্ড রিলিজেরও কোনো বিষয় ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মৌখিক নির্দেশেই বর্তমান ডিসি মো. রেজাউল করিম তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বভার ফরিদা খানমের কাছে বুঝিয়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানা যায়।

ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে এ ধরনের পদায়ন নিয়ে দেশজুড়ে বইছে আলোচনার ঝড়। নিয়োগের খবর ফাঁস হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সচেতন মহলের অনেকে ‘দুর্নীতিবিরোধী’ এই বিএনপি সরকারের আমলে এমন ঘটনায় হতবাকও হয়েছেন। বিএনপিপন্থিরা পর্যন্ত চরম হতাশা ব্যক্ত করছেন। অতীতে কোনো ডিসি পদে পদায়নে এতটা সমালোচনা হয়নি, যা ফরিদা খানমের ক্ষেত্রে হলো। বিএনপির লোকজন বলছেন, ফরিদা খানম যদিও এক সময় ছাত্রদলের বড় নেত্রী ছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ গানের মধ্য দিয়ে তার সেই পরিচয়ের বিলুপ্তি ঘটেছে। আওয়ামী লীগের ষোল বছরে, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারেরও দেড় বছরে তার মধ্যে বিএনপির কোনো পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তিনি জামায়াতের সুপারিশে চট্টগ্রামের ডিসি হন। দুর্নীতির কারণে বিতর্কিত এবং বিএনপির সুপারিশে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারির পর জামায়াত-এনসিপি-ই তাকে পুনরায় চট্টগ্রামে বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলন করেছে। তাছাড়া তিনি যদি বিএনপির লোকও হন, সরকার কেন তার মতো একজন আলোচিত, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজকে ঢাকার ডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন দেবে—এত সমালোচনার ভার নেবে—এ প্রশ্ন অনেকেরই।

ঢাকার নতুন ডিসির বিস্ময়কর যোগদান!

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ফরিদা খানমের ঢাকার ডিসি পদে পদায়ন-সংক্রান্ত নথি অনুমোদনের আগেই প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এবং প্রজ্ঞাপন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোডের আগেই ফরিদা খানম দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য পুরান ঢাকাস্থ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে দৌড়ে যান। নিয়ম অনুযায়ী জরুরি প্রত্যাহারের কোনো বিষয় না থাকলে কর্মরত জেলা প্রশাসকরা দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য কয়েকদিন সময় হাতে পান। এক্ষেত্রে রেজাউল করিমকে জরুরি প্রত্যাহারের কোনো বিষয় ছিল না—এটা জানা কথাই। তারপরও প্রজ্ঞাপন জারির মাত্র দুই ঘণ্টার মাথায় ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফরিদা খানম। বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিকেলেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মাঠ প্রশাসনের ইতিহাসে এমন দ্রুত যোগদানকে বিস্ময়কর হিসেবে দেখছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরে ফরিদা খানমকে ঢাকার জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপন আপলোড হয় বিলম্বে, বিকেলের দিকে। তবে কর্মরত ডিসি মো. রেজাউল করিমের কাছে প্রজ্ঞাপনের কপি এসে যায়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নতুন কর্মকর্তার যোগদানের সময় জানতে চাওয়া হয়। সেখান থেকে জানানো হয়, নতুন ডিসি আগামী সপ্তাহে যোগদান করবেন। এর মধ্যে দুপুর ২টার দিকে ফরিদা খানম ফোন করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় ডিসি রেজাউল করিমকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত তড়িঘড়িভাবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্ব হস্তান্তরের আয়োজন করতে বাধ্য হন। জরুরি প্রত্যাহার এবং স্ট্যান্ড রিলিজের ক্ষেত্রে যে সময়টুকু একজন ডিসির পাওয়ার কথা, এক্ষেত্রে তাও পাননি মো. রেজাউল করিম।

প্রজ্ঞাপন বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল

ঢাকার জেলা প্রশাসক পদের দায়িত্ব এতটা দ্রুততার সঙ্গে হস্তান্তরের নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে জানা গেল, নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরের সপ্তাহে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা বললেও, ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রজ্ঞাপন বাতিল হওয়ার আশঙ্কা ছিল—এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে আব্দুর রশীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছিল। এটি মাথায় রেখেই ফরিদা খানমের দায়িত্ব গ্রহণের কাজটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করা হয়, যাতে সহজেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা না যায়। প্রজ্ঞাপন বাতিল হলে ৩০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি উঠবে। সেটি জটিলতায় যেতে চাননি সরকারের ভেতরের শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এদের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি নয়, অবৈধ অর্থ আয়ই মুখ্য।

চট্টগ্রামে যা করে এসেছেন ডিসি ফরিদা

গোপালগঞ্জের মেয়ে, প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ফরিদা খানম চাকরি জীবনের শুরু থেকেই ছিলেন দুর্নীতিতে অত্যন্ত বেপরোয়া। এসি ল্যান্ড পদে থাকাকালেই তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বিশেষ করে নরসিংদী সদর এবং নারায়ণগঞ্জ সদরের এসি ল্যান্ড থাকাকালে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ আয় করেন। দুর্নীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন চট্টগ্রামের ডিসি থাকাকালে। চট্টগ্রামে আওয়ামী ভূমিদস্যুদের হাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার ৫০ একর জমি ছেড়ে দেন। বিনিময়ে তিনি হাতিয়ে নেন বিপুল অঙ্কের অর্থ। অবৈধভাবে খাসজমি লিজ, বালুমহাল ইজারা, রেকর্ড জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক খাতের তহবিল অন্য খাতে ব্যয় করাসহ নানা ধরনের লাগামহীন দুর্নীতি-অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে গণমাধ্যমের খবরের শিরোনামও হন দফায় দফায়।

৫ আগস্ট, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ৯ সেপ্টেম্বর ফরিদা খানম চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগ পান। তার পরবর্তী টার্গেট ছিল ঢাকার ডিসি হওয়া। ঢাকার ডিসি হওয়ার জন্য বেশি পরিমাণে টাকার দরকার। সেখানকার সহকর্মীদের সামনে প্রকাশ্যেই তিনি একথা বলেছেন। এই টার্গেট পূরণের জন্যই মূলত শুরু থেকে ব্যাপকহারে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরও তার দুর্নীতি প্রবণতা মোটেই কমেনি। বরং তিনি ক্রমান্বয়েই বেপরোয়া হয়ে উঠছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু ছিল জামায়াত-ছাত্র সমন্বয়ক (এনসিপি) প্রভাবিত, তাই এদের খুশি করার জন্য বিএনপির বিপক্ষে অবস্থান নেন। তাছাড়া ফরিদার চট্টগ্রামে পদায়নেও ছিল জামায়াতের হাত। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের মাত্র ৬ মাসের মাথায় শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের অন্তত ৫০ একর জমি ছেড়ে দিয়েছেন আওয়ামী ভূমিদস্যুদের হাতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার বিরল নজির স্থাপন করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে প্রশাসন ক্যাডারদের পিকনিক, পুনর্মিলনী, বিজ্ঞাপন এবং ব্যক্তিগত খাতেও টাকা খরচ করেছেন তিনি। চিড়িয়াখানার টাকায় রং করা হয়েছে ডিসি পার্কও। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক বছর আগে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ করা পরীর পাহাড়ের ২৩ শতকের বেশি জায়গা গোপনে দুটি পক্ষের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। এসব সরকারি জমি ভূমিদস্যুদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে শত কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা যায়।

ক্রমাগত এসব অনৈতিক ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তাকে চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তার প্রত্যাহারে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভূমিকা ছিল। বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। এর ফলে তাকে চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে স্থানীয় জামায়াত এবং এনসিপি ফরিদাকে বহাল রাখার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশও করে তখন।

ফরিদার দুর্নীতি নিয়ে দুদকের তদন্ত

গত বছরের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের ডিসি পদ থেকে প্রত্যাহারের পরপরই ফরিদা খানমের দুর্নীতি নিয়ে দুদকের তদন্ত শুরু হয়। প্রাথমিক তদন্তে তার দুর্নীতির প্রমাণও পাওয়া যায়। এরপরে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। ফরিদার দুর্নীতি তদন্ত করছেন দুদকের উপপরিচালক মো. রাশেদুল ইসলাম। তিনি গত ২৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক কার্যালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহে এ-সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে নথি তলব করেন। ২৩ অক্টোবর, ২০২৫ ভূমি সচিব বরাবর লেখা মো. রাশেদুল ইসলামের চিঠিতে বলা হয়, “ফরিদা খানম, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ—অনুসন্ধানের স্বার্থে নিম্নলিখিত তথ্যাদি/রেকর্ডপত্রাদি পর্যালোচনা করা একান্ত প্রয়োজন।” চিঠিতে বলা হয়, “চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর ইজারাকৃত বালুমহালের ইজারাভুক্ত এলাকার বেতাগী মৌজার বালু উত্তোলনের মাধ্যমে আনুমানিক হারে রাজস্ব আদায়-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যায়িত ফটোকপি এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম, বর্তমান পদবি ও মোবাইল নম্বর-সংক্রান্ত তথ্যাদি।” “চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ থানার হিলভিউ আবাসিক এলাকায় খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারির বিষয়ে জনাব ফরিদা খানম, সাবেক জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রামসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে যে সকল তদন্ত পরিচালিত হয়েছে, উক্ত তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যায়িত ফটোকপি।”

ফরিদা ছাত্রত্বকালে ছাত্রদলের নেত্রী ছিলেন। রোকেয়া হল শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দলের সঙ্গে মিশে যান। ওই সময় তিনি নরসিংদী সদর এবং নারায়ণগঞ্জ সদরের মতো এসি ল্যান্ড পদে পদায়নও পান। ২০১৫ সালের ১ আগস্ট ভারতের দেহরাদুনে একটি সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সময় ফরিদা খানম ‘বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ গানটি পরিবেশন করেন। বাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ায় আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়া তার জন্য সহজও হয়। টাঙ্গাইল ডিসি অফিসে সিনিয়র সহকারী কমিশনার, ফেনীর দাগনভূঞা এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইউএনও পদে পদায়ন পান। কিন্তু এসিল্যান্ড এবং ইউএনও পদে পদায়নে থাকাকালেও দুর্নীতির কারণে তখনও তিনি সমালোচিত হন।

৫ আগস্ট, ২০২৪-এর পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু জামায়াত-ছাত্র সমন্বয়ক প্রভাবিত, তাই সুযোগ বুঝে এই গ্রুপে যোগ দেন। অথচ ‘মুজিবপ্রেমী’, ‘বিতর্কিত’, ‘দুর্নীতিবাজ’ এই কর্মকর্তাকেই ঢাকার ডিসি পদে পদায়নের জন্য প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি অনেকটা ‘উঠেপড়ে’ নামে। বিভিন্ন ফাঁকে তার ‘ভুয়া’ ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে। এক সময় তিনি ছাত্রদলের নেত্রী ছিলেন—ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুধু এই পরিচয়টাই প্রধানমন্ত্রীর সামনে আনা হয়। এরপরে আওয়ামী লীগ আমলের ১৫ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দেড় বছরে কী করেছেন, এ-সংক্রান্ত সব তথ্যই গোপন রাখা হয় অথবা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে।

শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক পদে পদায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে রাজি করানো হয়। এমন প্রচারণা চালানো হয় যে, ফরিদা খানমকে প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে পদায়ন করতে চান, কিন্তু ফরিদা রাজি হচ্ছেন না। এখন প্রচারণা চালানো হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে উদ্যোগী হয়ে ফরিদা খানমকে ঢাকার ডিসি করেছেন। এতে অন্য কারও হাত নেই। যদিও আদতে এটা ডাহা মিথ্যা। শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটটি নিজেদের সব অপকর্মের দায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হলেও এদের নিজেদের ব্যক্তিগত লাভ হচ্ছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ২২ এপ্রিল দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি স্লিপ পাঠানো হয় এবং সেই স্লিপের ভিত্তিতেই ফরিদা খানমকে ঢাকার ডিসি পদে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। পরবর্তীতে এ-সংক্রান্ত নথি তৈরি এবং অনুমোদন নেওয়া হয়।

জনপ্রিয়

কোন পথে বাংলাদেশ?

দুদকের তদন্ত চলাকালেই ঢাকার জেলা প্রশাসক পদে পদায়ন; সিন্ডিকেটের প্রভাব, তড়িঘড়ি দায়িত্ব হস্তান্তর ও ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সরকার

ঢাকার ডিসি পদে ফরিদা খানম: নিয়োগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড়

প্রকাশিত : ১১:২৪:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই একের পর এক সমালোচনা ও বিতর্কে জড়াচ্ছে। এবং এ ধরনের প্রায় প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সেই একই শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরাসরিভাবে জড়িত রয়েছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সর্বশেষ, ঢাকার জেলা প্রশাসক পদে বহুল আলোচিত, বিতর্কিত, শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ফরিদা খানমের নিয়োগ নিয়ে এখন ব্যাপক তোলপাড় চলছে। চট্টগ্রামের ডিসি থাকাকালের ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তও চলছিল। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে ফরিদা খানমের গুরুতর অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং দুদকের পক্ষ থেকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের কাজও শুরু করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার মধ্যেই তাকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পদ, ঢাকার ডিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান সময়ের আলোচিত দুর্নীতিবাজ এই নারী কর্মকর্তাকে ঢাকার ডিসি পদে নিয়োগে প্রভাব খাটিয়েছে ওই একই সিন্ডিকেট।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এ-সংক্রান্ত সঠিক তথ্য তুলে ধরা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে রাজি করানো হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে সিন্ডিকেটের ৩০ কোটি টাকার লেনদেন। সিন্ডিকেটে রয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রীর পিএস মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী। এছাড়া বহুল আলোচিত ও ‘সুপার পাওয়ারফুল’ বলে পরিচিত স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী তো রয়েছেনই। এই সিন্ডিকেটেরই একজনের আপন মেয়ের জামাই, জুডিশিয়াল ক্যাডারের সদস্য, বর্তমানে যিনি আইন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে আছেন—তার মাধ্যমেই এই টাকার লেনদেন হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে ঢাকার ডিসির দায়িত্বভার হস্তান্তর নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। ফরিদা খানমকে ঢাকার ডিসি পদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য মাত্র দুই ঘণ্টা সময় হাতে পেয়েছেন কর্মরত ডিসি রেজাউল করিম। যদিও তাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদায়নের ঘটনাটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ এবং এতে স্ট্যান্ড রিলিজেরও কোনো বিষয় ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মৌখিক নির্দেশেই বর্তমান ডিসি মো. রেজাউল করিম তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বভার ফরিদা খানমের কাছে বুঝিয়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানা যায়।

ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে এ ধরনের পদায়ন নিয়ে দেশজুড়ে বইছে আলোচনার ঝড়। নিয়োগের খবর ফাঁস হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সচেতন মহলের অনেকে ‘দুর্নীতিবিরোধী’ এই বিএনপি সরকারের আমলে এমন ঘটনায় হতবাকও হয়েছেন। বিএনপিপন্থিরা পর্যন্ত চরম হতাশা ব্যক্ত করছেন। অতীতে কোনো ডিসি পদে পদায়নে এতটা সমালোচনা হয়নি, যা ফরিদা খানমের ক্ষেত্রে হলো। বিএনপির লোকজন বলছেন, ফরিদা খানম যদিও এক সময় ছাত্রদলের বড় নেত্রী ছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ গানের মধ্য দিয়ে তার সেই পরিচয়ের বিলুপ্তি ঘটেছে। আওয়ামী লীগের ষোল বছরে, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারেরও দেড় বছরে তার মধ্যে বিএনপির কোনো পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তিনি জামায়াতের সুপারিশে চট্টগ্রামের ডিসি হন। দুর্নীতির কারণে বিতর্কিত এবং বিএনপির সুপারিশে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারির পর জামায়াত-এনসিপি-ই তাকে পুনরায় চট্টগ্রামে বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলন করেছে। তাছাড়া তিনি যদি বিএনপির লোকও হন, সরকার কেন তার মতো একজন আলোচিত, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজকে ঢাকার ডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন দেবে—এত সমালোচনার ভার নেবে—এ প্রশ্ন অনেকেরই।

ঢাকার নতুন ডিসির বিস্ময়কর যোগদান!

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ফরিদা খানমের ঢাকার ডিসি পদে পদায়ন-সংক্রান্ত নথি অনুমোদনের আগেই প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এবং প্রজ্ঞাপন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোডের আগেই ফরিদা খানম দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য পুরান ঢাকাস্থ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে দৌড়ে যান। নিয়ম অনুযায়ী জরুরি প্রত্যাহারের কোনো বিষয় না থাকলে কর্মরত জেলা প্রশাসকরা দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য কয়েকদিন সময় হাতে পান। এক্ষেত্রে রেজাউল করিমকে জরুরি প্রত্যাহারের কোনো বিষয় ছিল না—এটা জানা কথাই। তারপরও প্রজ্ঞাপন জারির মাত্র দুই ঘণ্টার মাথায় ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফরিদা খানম। বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিকেলেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মাঠ প্রশাসনের ইতিহাসে এমন দ্রুত যোগদানকে বিস্ময়কর হিসেবে দেখছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরে ফরিদা খানমকে ঢাকার জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপন আপলোড হয় বিলম্বে, বিকেলের দিকে। তবে কর্মরত ডিসি মো. রেজাউল করিমের কাছে প্রজ্ঞাপনের কপি এসে যায়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নতুন কর্মকর্তার যোগদানের সময় জানতে চাওয়া হয়। সেখান থেকে জানানো হয়, নতুন ডিসি আগামী সপ্তাহে যোগদান করবেন। এর মধ্যে দুপুর ২টার দিকে ফরিদা খানম ফোন করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় ডিসি রেজাউল করিমকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত তড়িঘড়িভাবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্ব হস্তান্তরের আয়োজন করতে বাধ্য হন। জরুরি প্রত্যাহার এবং স্ট্যান্ড রিলিজের ক্ষেত্রে যে সময়টুকু একজন ডিসির পাওয়ার কথা, এক্ষেত্রে তাও পাননি মো. রেজাউল করিম।

প্রজ্ঞাপন বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল

ঢাকার জেলা প্রশাসক পদের দায়িত্ব এতটা দ্রুততার সঙ্গে হস্তান্তরের নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে জানা গেল, নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরের সপ্তাহে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা বললেও, ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রজ্ঞাপন বাতিল হওয়ার আশঙ্কা ছিল—এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে আব্দুর রশীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছিল। এটি মাথায় রেখেই ফরিদা খানমের দায়িত্ব গ্রহণের কাজটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করা হয়, যাতে সহজেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা না যায়। প্রজ্ঞাপন বাতিল হলে ৩০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি উঠবে। সেটি জটিলতায় যেতে চাননি সরকারের ভেতরের শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এদের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি নয়, অবৈধ অর্থ আয়ই মুখ্য।

চট্টগ্রামে যা করে এসেছেন ডিসি ফরিদা

গোপালগঞ্জের মেয়ে, প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ফরিদা খানম চাকরি জীবনের শুরু থেকেই ছিলেন দুর্নীতিতে অত্যন্ত বেপরোয়া। এসি ল্যান্ড পদে থাকাকালেই তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বিশেষ করে নরসিংদী সদর এবং নারায়ণগঞ্জ সদরের এসি ল্যান্ড থাকাকালে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ আয় করেন। দুর্নীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন চট্টগ্রামের ডিসি থাকাকালে। চট্টগ্রামে আওয়ামী ভূমিদস্যুদের হাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার ৫০ একর জমি ছেড়ে দেন। বিনিময়ে তিনি হাতিয়ে নেন বিপুল অঙ্কের অর্থ। অবৈধভাবে খাসজমি লিজ, বালুমহাল ইজারা, রেকর্ড জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক খাতের তহবিল অন্য খাতে ব্যয় করাসহ নানা ধরনের লাগামহীন দুর্নীতি-অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে গণমাধ্যমের খবরের শিরোনামও হন দফায় দফায়।

৫ আগস্ট, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ৯ সেপ্টেম্বর ফরিদা খানম চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগ পান। তার পরবর্তী টার্গেট ছিল ঢাকার ডিসি হওয়া। ঢাকার ডিসি হওয়ার জন্য বেশি পরিমাণে টাকার দরকার। সেখানকার সহকর্মীদের সামনে প্রকাশ্যেই তিনি একথা বলেছেন। এই টার্গেট পূরণের জন্যই মূলত শুরু থেকে ব্যাপকহারে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরও তার দুর্নীতি প্রবণতা মোটেই কমেনি। বরং তিনি ক্রমান্বয়েই বেপরোয়া হয়ে উঠছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু ছিল জামায়াত-ছাত্র সমন্বয়ক (এনসিপি) প্রভাবিত, তাই এদের খুশি করার জন্য বিএনপির বিপক্ষে অবস্থান নেন। তাছাড়া ফরিদার চট্টগ্রামে পদায়নেও ছিল জামায়াতের হাত। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের মাত্র ৬ মাসের মাথায় শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের অন্তত ৫০ একর জমি ছেড়ে দিয়েছেন আওয়ামী ভূমিদস্যুদের হাতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার বিরল নজির স্থাপন করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে প্রশাসন ক্যাডারদের পিকনিক, পুনর্মিলনী, বিজ্ঞাপন এবং ব্যক্তিগত খাতেও টাকা খরচ করেছেন তিনি। চিড়িয়াখানার টাকায় রং করা হয়েছে ডিসি পার্কও। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক বছর আগে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ করা পরীর পাহাড়ের ২৩ শতকের বেশি জায়গা গোপনে দুটি পক্ষের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। এসব সরকারি জমি ভূমিদস্যুদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে শত কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা যায়।

ক্রমাগত এসব অনৈতিক ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তাকে চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তার প্রত্যাহারে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভূমিকা ছিল। বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। এর ফলে তাকে চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে স্থানীয় জামায়াত এবং এনসিপি ফরিদাকে বহাল রাখার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশও করে তখন।

ফরিদার দুর্নীতি নিয়ে দুদকের তদন্ত

গত বছরের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের ডিসি পদ থেকে প্রত্যাহারের পরপরই ফরিদা খানমের দুর্নীতি নিয়ে দুদকের তদন্ত শুরু হয়। প্রাথমিক তদন্তে তার দুর্নীতির প্রমাণও পাওয়া যায়। এরপরে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। ফরিদার দুর্নীতি তদন্ত করছেন দুদকের উপপরিচালক মো. রাশেদুল ইসলাম। তিনি গত ২৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক কার্যালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহে এ-সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে নথি তলব করেন। ২৩ অক্টোবর, ২০২৫ ভূমি সচিব বরাবর লেখা মো. রাশেদুল ইসলামের চিঠিতে বলা হয়, “ফরিদা খানম, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ—অনুসন্ধানের স্বার্থে নিম্নলিখিত তথ্যাদি/রেকর্ডপত্রাদি পর্যালোচনা করা একান্ত প্রয়োজন।” চিঠিতে বলা হয়, “চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর ইজারাকৃত বালুমহালের ইজারাভুক্ত এলাকার বেতাগী মৌজার বালু উত্তোলনের মাধ্যমে আনুমানিক হারে রাজস্ব আদায়-সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যায়িত ফটোকপি এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম, বর্তমান পদবি ও মোবাইল নম্বর-সংক্রান্ত তথ্যাদি।” “চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ থানার হিলভিউ আবাসিক এলাকায় খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারির বিষয়ে জনাব ফরিদা খানম, সাবেক জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রামসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে যে সকল তদন্ত পরিচালিত হয়েছে, উক্ত তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যায়িত ফটোকপি।”

ফরিদা ছাত্রত্বকালে ছাত্রদলের নেত্রী ছিলেন। রোকেয়া হল শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দলের সঙ্গে মিশে যান। ওই সময় তিনি নরসিংদী সদর এবং নারায়ণগঞ্জ সদরের মতো এসি ল্যান্ড পদে পদায়নও পান। ২০১৫ সালের ১ আগস্ট ভারতের দেহরাদুনে একটি সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সময় ফরিদা খানম ‘বঙ্গবন্ধু মরে নাই’ গানটি পরিবেশন করেন। বাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ায় আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়া তার জন্য সহজও হয়। টাঙ্গাইল ডিসি অফিসে সিনিয়র সহকারী কমিশনার, ফেনীর দাগনভূঞা এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইউএনও পদে পদায়ন পান। কিন্তু এসিল্যান্ড এবং ইউএনও পদে পদায়নে থাকাকালেও দুর্নীতির কারণে তখনও তিনি সমালোচিত হন।

৫ আগস্ট, ২০২৪-এর পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু জামায়াত-ছাত্র সমন্বয়ক প্রভাবিত, তাই সুযোগ বুঝে এই গ্রুপে যোগ দেন। অথচ ‘মুজিবপ্রেমী’, ‘বিতর্কিত’, ‘দুর্নীতিবাজ’ এই কর্মকর্তাকেই ঢাকার ডিসি পদে পদায়নের জন্য প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি অনেকটা ‘উঠেপড়ে’ নামে। বিভিন্ন ফাঁকে তার ‘ভুয়া’ ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে। এক সময় তিনি ছাত্রদলের নেত্রী ছিলেন—ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুধু এই পরিচয়টাই প্রধানমন্ত্রীর সামনে আনা হয়। এরপরে আওয়ামী লীগ আমলের ১৫ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের দেড় বছরে কী করেছেন, এ-সংক্রান্ত সব তথ্যই গোপন রাখা হয় অথবা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে।

শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক পদে পদায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে রাজি করানো হয়। এমন প্রচারণা চালানো হয় যে, ফরিদা খানমকে প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে পদায়ন করতে চান, কিন্তু ফরিদা রাজি হচ্ছেন না। এখন প্রচারণা চালানো হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে উদ্যোগী হয়ে ফরিদা খানমকে ঢাকার ডিসি করেছেন। এতে অন্য কারও হাত নেই। যদিও আদতে এটা ডাহা মিথ্যা। শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটটি নিজেদের সব অপকর্মের দায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হলেও এদের নিজেদের ব্যক্তিগত লাভ হচ্ছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ২২ এপ্রিল দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি স্লিপ পাঠানো হয় এবং সেই স্লিপের ভিত্তিতেই ফরিদা খানমকে ঢাকার ডিসি পদে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। পরবর্তীতে এ-সংক্রান্ত নথি তৈরি এবং অনুমোদন নেওয়া হয়।