বহুল আলোচিত লেখক, ব্লগার রোমানা আক্তার রুমকিকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার বাসভবনে পরিকল্পিত হামলা চালায় একদল উগ্রপন্থী গোষ্ঠী। এসময় দুর্বৃত্তরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। পরিবারের সদস্যদের শারীরির এবং মানুষিকভাবেও লাঞ্চিত করে।
গত ৩১ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) মধ্যরাতে রোমানা আক্তার রুমকির ঢাকার রামপুরায় অবস্থিত নিজ বাসায় এ অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। ব্লগার ও লেখক রোমানা আক্তার রুমকি ২০২১ সালে এথিস্ট এরা ম্যাগাজিন, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ এ এথিস্ট নোট, এথিস্ট ইন বাংলাদেশ এর ওয়েবে নিয়মিত ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি, ধর্মান্ধতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমকামী, উভকামী, সমাজের অবহেলিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকারের এবং ধর্মীও উগ্রবাদীদের বিষয়ে নিয়মিত লিখা প্রকাশ করে আসছিলেন।
রোমানার পিতা রবিউল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “রোমানা উদারপন্থী। সে একজন অধিকার কর্মী। এরই জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও জানান। এরা উগ্রপন্থী কোন গোষ্ঠীরই সদস্য বলেও জানান তিনি। ইতোপূর্বেও গত ৫ই আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার পর একই কায়দায় হামলা চালায় এ গোষ্ঠীটি। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা বাদী হয়ে মামলা করতে গেলে থানায় মামলা নেয়নি পুলিশ।”
তিনি আরও বলেন, “প্যান্ট আর হাফ শার্ট পড়া চারজন যুবক কিছু বুঝে উঠার আগেই দরজা ভেঙ্গে অতর্কিতে ভেতরে ঢুকে যায়। যুবকদের পুরো মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিলো এবং চোখে ছিলো কালো চশমা। সবার হাতেই দেশীয় ধারালো অস্ত্র (রামদা, চাপাতি) ছিলো। অস্ত্রের মুখে তারা রোমানার অবস্থান জানতে চায়। সে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছে। উগ্রপন্থী এ গোষ্ঠীটি লন্ডনে তার অবস্থান নিশ্চিত হতে চায়। সেখানে তার অবস্থান জানাতে না চাওয়ায় তারা পুরো বাড়িতে এলোপাথাড়ি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। পরিবারের সকল সদস্যদের বেধড়ক মারধর করে এক পর্যায়ে বাসার বাইরে তালা লাগিয়ে চলে যায়। আমিও এই হামলার ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হই।”
রোমানা আক্তার রুমকি, কট্টর ইসলামের সমালোচনা ও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদের জন্য বাংলাদেশের ইসলামিস্টদের নিকট আক্রমণের লক্ষ্যবস্ত। বাংলাদেশে বিগত সময়ে অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় দাস, আরেফিন দীপন সহ অসংখ্য মুক্তচিন্তক, ব্লগার, লেখক প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে। নাস্তিক ও ইসলামবিরোধী ফতোয়া দিয়ে তাদের হত্যার জন্য নামের তালিকা প্রকাশ করেছিল ও তাদের হত্যার জন্য ক্যাম্পেইন করেছিল জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাসী সংগঠন আনসার আল ইসলাম, হিজবুত তাহরির, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামি ঐক্যজোট এর কর্মীরা।
উল্লেখ্য বিভিন্ন সমর্থিত ও অসমর্থিত সূত্রের দাবী, গত ৫ই আগস্টের পর থেকে প্রান্তিক বিবিধ গোষ্ঠীর সদস্যরা একাধিকবার দেশের বিভিন্ন স্থানে হেনস্থা, হয়রানি, হামলা ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছে পুনরুত্থিত ইসলামিক দলগুলোর কাছে। ধর্মানুভূতিতে আঘাত সহ সমকামী, উভকামী এবং ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে প্রকাশিত লেখার জের ধরেই এসব পরিকল্পিত হামলার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত অনেক লেখক, ব্লগার, অধিকার কর্মীরা সম্প্রতি নিজ নিজ বাসস্থানে হামলা ও হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে গত ২২শে অক্টোবর আরেক লেখক, ব্লগার মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের চট্টগ্রাম বন্দরের কলসী’তে অবস্থিত নিজ বাসায় হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় দুর্বৃত্তরা অস্ত্রসহ হামলা চালায় ও পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। তিনি এথিস্ট এরা ম্যাগাজিনে ২০২১ সাল থেকে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করে আসছেন। এবং এথিস্ট এরার একজন কর্মী এবং এথিস্ট নোট এ বিবিধ সময়ে লিখা ছাঁপিয়েছেন।
হামলার বিষয়ে রাজ্জাকের পিতা নুরুল আলম দেশবার্তাকে জানান, “পরিবারের সবাইকে লাঞ্চিত করে। নারীদের যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করা হয়। লাঞ্চিত করা হয়।”
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক লেখক ও ব্লগারদের হত্যার উদ্দেশ্যে বাসভবনে দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে রয়েছে লেখক, ব্লগার মনিরা পারভীন, মোঃ জাকির হোসাইন, শিপলু কুমার বর্মন, আনিকা হক মল্লিক, মোঃ শহীদুল ইসলাম জায়গীরদার, মোঃ রাজিম হোসাইন, গাজী সাইফুল, মিজানুর রহমান, আবু বকর সিদ্দীক, কমল চন্দ্র দাস, ফাতেহা তাসবি, খোকন উদ্দীন, মোঃ আবির হোসাইন, এমডি উমায়েদ হোসাইন, আরমান হোসাইন, এমডি হাবিবুর রহমান সাব্বির সহ প্রমুখ। বিভিন্ন সূত্রে দেখা দায় এসব লেখক, ব্লগারদের বেশিরভাগই ইসলাম ভিত্তিক গড়ে উঠা উগ্রবাদী গোষ্ঠী, ধর্মনিরপেক্ষতা, ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামীদের অধিকার ইস্যুতে সরব ছিলো।
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাবার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দেশের উগ্রবাদী ধর্মীও গোষ্ঠীর নতুন ভাবে আত্মপ্রকাশের বিষয়গুলো সামনে আসছে। একই সাথে দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সহ লেখালেখির সাথে জড়িত লেখক, ব্লগার ও অধিকার কর্মীদেরও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার সাথে হামলার মুখেও পড়ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















