ইতিহাস সত্য কিন্তু ইতিহাস সময়ের বাহকের সাথে পরিবর্তিত হয়, এটাও সত্য। তবে সত্য সত্যই থেকে যায়। ১৯৭১ হতে ১৯৭৫ পর্যন্ত এবং ২০০৯ হতে ২০২৪ এর বাংলাদেশের ইতিহাসের খুব বেশী পার্থক্য আমি দেখি না। ৭৫ এর ১৫ই আগস্টে যে বিপ্লব হয়েছিল তা যেকোন কারণেই হোক না কেন, বেহাত হয়ে যাবার ফলে আমরা সারা জীবন শুনে এসেছি “কতিপয় বিপথগামী সেনা অফিসার” এর কথা। আমি খুব দৃঢ় ভাবেই বলতে চাই, তারা বিপথগামী সেনা অফিসার ছিল না ববং তারা ছিলেন কতিপয় বিপ্লবী সেনা অফিসার।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব, যে চেতনাকে গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী দুঃশাসনের লোকেরা মুখে ফেনা তুলে প্রচার করেছে, সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংসদীয় পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি কোন বিরোধীদল পছন্দ করতেন না, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। তাই তিনি ১৯৭৩ নির্বাচনে নিশ্চিত জয় জেনেও কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিলেন। কারন তিনি চান নি তার কোন বিরোধীদল থাকুক। তাই তিনি কারচুপির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন ৩০০টি সিটের মধ্যে ২৯২ টি সিট। কারন ১০টি সিটের কম হলে কোন বিরোধীদল গঠন করা যায় না। তাছাড়া তিনি সকল রাজনৈতিক দলের বিলুপ্ত ঘটিয়ে ১৯৭৫ এর জানুয়ারিতে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতি বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নিয়ে দেশের সকল ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হয়ে ওঠেন।
তার এহেন কর্মকান্ডে তার ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহচর তাজউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, আপনাকে শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের কোন পথ খোলা রাখলেন না। ১৯৭২ সালে তিনি একটি প্যারালাল সেনাবাহিনী তৈরী করেন, যার নাম আমরা সবাই জানি, রক্ষীবাহিনী। যে বাহিনী সম্পর্কে রাজনৈতিক হত্যাসহ মানবাধিকার অপব্যবহারের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তার শাসনামলে মাত্র ৪ টি সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো। ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্টে তার স্বৈরতন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে মানুষজন স্বস্তিঃর নিঃশ্বাস ফেলেছে, এমন কি মানুষজন আনন্দে কোলাকুলি করেছে। ঠিক যেমনটি আমরা দেখলাম ৫ই আগস্ট ২০২৪।
তাহলে এই মানুষটি এতটা মহৎ হয় কিভাবে? অনেকেই তার ৭১ এর স্বাধীনতা পূর্ববর্তী তার ভুমিকার কথা বলবেন। কিন্তু সত্য হলো তিনি কখনোই স্বাধীন বাংলাদেশ চাননি। এটা আপনি মানুন আর নাই মানুন। বাংলাদেশের জন্ম ও অস্তিত্বের মর্মমূলে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করার অর্থ, বাংলাদেশকে অস্বীকার করা, – এই কথার সাথে আমি একমত নই। তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে লাখো বাঙালীর হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন বপন করেছিলেন ঠিকই কিন্তু একই সাথে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদেরকে এই ভাষণের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা হস্তান্তরের হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি সকল কিছুর উর্ধ্বে অখন্ড পাকিস্তানের জন্যই শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন। তাই ২৫ মার্চ রাতে তিনি গ্রেফতারের পূর্বে তাজউদ্দিন তার কাছে স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র নিয়ে গেলেও তিনি তাতে স্বাক্ষর করেননি। তিনি তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে।’ ২৫ মার্চের সেই রাতে তিনি আওয়ামীলীগ নেতা ও কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সহকর্মীদের সকল অনুরোধ উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্তে রয়ে গেলেন নিজ বাসভবনে। সেখান থেকে তিনি গ্রেফতার হলেন হত্যাযজ্ঞের প্রহরে। অর্থাৎ তিনি জানতেন তাকে সাধারণ জনগণের মতো নিহত হতে হবে না।
দেশ স্বাধীন হবার পরে ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব নিজেই বলেছেন, আমি ৭ই মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেইনি, কারণ আমি পাকিস্তান ভাঙতে চাইনি। তাহলে কোন যুক্তিতে আমি তাকে স্বাধীনতার রূপকার বলবো?
যে ব্যক্তি স্বাধীনতা যুদ্ধে স্বাধীনতার মহানায়ক তাজউদ্দিন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা অস্বীকার করে, যে ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর ভুমিকা অস্বীকার করে তাকে আমি কোনদিনই একজন অবিসংবাদিত নেতার আসনে বসাতে পারিনা।
১৫ই আগস্ট যার যার, কিন্তু শোক সবার, এই তত্ত্বে আমি বিশ্বাসী নই। এই কথা একজন বোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার পর এই প্রথম বলতে পারছি। এই স্বাধীনতার স্বাদ জেগে উঠুক প্রত্যেক বাংলাদেশীর হৃদয়ে।
জেন জেড কে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ এই সাধারন সত্য কথাটা বলার স্বাধীনতা ও সাহস দেয়ার জন্য। তবে এই স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে হবে। নয়তো তোমরাও একদিন পরিবর্তিত ইতিহাসে কতিপয় বিপথগামী শিক্ষার্থী হিসেবে আখ্যায়িত হবে।
তথ্য সহযোগীতায়- মেজর( অব.) আখলাক জামান।
কাজল জালালী 













