০৪:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

এসব আউট বই পড়ে কি হয়?

ছবি: জান্নাতুন নাঈম প্রীতি


ক্লাস এইটে রেজাল্ট খারাপ হওয়া উপলক্ষে আমার স্কুলের হেডমাস্টার আপা আম্মুকে স্কুলে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন- আপনার মেয়ে সারাদিন কি করে? আম্মু কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললেন- বই পড়ে।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এসব আউট বই পড়ে কি হয়?
এখন থেকে বই আলমারিতে তুলে রাখবেন নাইলে মোম ঘষে রাখবেন।
আমার মা অপরাধীর মতো বললেন- জ্বি, আচ্ছা।

বাস্তবে তিনি সেটা করলেন না, শুধু বললেন- রেজাল্ট খারাপ করলে পরে খাবি কি? আমি খাওয়ার চিন্তায় পড়ালেখা দ্বিগুণ করলাম-মানে স্কুলের বইও গল্পের বইয়ের পাশাপাশি পড়া শুরু করলাম।

তখন ওই হেডমাস্টার আপাকে বলতে পারিনি। কিন্তু এখন আমি বলছি বই পড়ে কি হয়, প্লিজ মন দিয়ে পড়ুন।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখা ‘আ মুভেবল ফিস্ট’ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ পড়ে আমার স্বপ্ন ছিলো প্যারিস নামের শিল্পের শহরে থাকব অন্তত তিন মাস। জীবন আমাকে দিলো ওই শহরে শহরের মেয়রের আমন্ত্রণে দুই বছর, চমৎকার স্টুডিও এপার্টমেন্ট, যেখান থেকে এক কদম হাঁটলেই ভিক্টোর হুগো’র ‘দ্যা হ্যাঞ্চব্যাক অব নতরদাম’ বইয়ে লেখা সত্যিকারের নতরদাম ক্যাথিড্রাল!

ওটা থেকে আরেক কদম হাঁটলেই দুনিয়ার সবচেয়ে পুরাতন বইয়ের দোকান ‘শেক্সপিয়ার এন্ড কোম্পানি’। প্যারিসে বসে লেখা আমার একমাত্র বই ওই বইয়ের দোকানের রিডিংরুমে বসেই লেখা।

সেবা প্রকাশনীর অনুবাদে ‘স্বপ্নসখা’ নামের একটা বই ছিলো ভিক্তরিয়া হল্টের লেখা। আসল নাম- ‘অন দ্যা নাইট অব সেভেন্থ মুন’। সেই বইয়ের পটভূমি ছিলো জার্মানির ব্ল্যাকফরেস্ট, যেখানের ব্ল্যাকফরেস্ট কেক ভুবন বিখ্যাত।
অথবা গ্রীম ভাইদের রূপকথার ‘হ্যানসেল গ্রেটেল’, ওদের জন্মও ব্ল্যাকফরেস্টেই।
একদিন জানলাম আমার বন্ধু তাসলিমা খানম আপা থাকেন ব্ল্যাকফরেস্টের মধ্যেকার ছবির মতো শহর ফ্রয়ডেন্সটাডে। এখন গ্রীষ্ম কিংবা বসন্ত, যখনই মন চায়, তখনই দেই ছুট!

অসলো’র আমন্ত্রণ যেদিন এলো সেদিন কাকতালীয়ভাবে মুরাকামির ‘নরওয়েজিয়ান উড’- সবে কিনলাম, উপন্যাসের পটভূমি টোকিও যদিও। তখনও জানতাম না এখন যিনি নরওয়ের নোবেল প্রাইজ কমিটির হেড- তিনিই আমন্ত্রণ জানাবেন ওই শহর ছুঁয়ে উটোয়া নামক দ্বীপে দুনিয়ার ৫০টা দেশের ৫০ জন ইয়াং লিডারের একজন হিসেবে।
ফিয়র্ডের জলে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ওদের কিংবদন্তি ইবসেনের ‘ডলস হাউস’ আর ন্যুট হামশুনের ভ্যাগাবন্ড, যার বাংলা সংস্করণ ‘হিমু’ লিখেছিলেন আমাদের হুমায়ূন আহমেদ, সেকথা ভেবেই মুচকি হাসি ফুটে উঠলো- সেই দেশ চিনতে আর কি লাগে?

গ্রীসের সেই কবি হোমার, যার লেখা ইলিয়াড আর ওডেসি না পড়লে গ্রীক পুরাণের হেলেন, এথেনাদের চেনা যায়না, সেই স্মৃতির নস্টালজিয়ায় দীর্ঘদিন আছন্ন ছিলাম।কিন্তু ওদেশের এথেন্সের কথা পড়েছিলাম প্রথম ইতিহাস বইতে।
কনফারেন্সে এসে নিজের পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে প্লেটো, এরিস্টটল, সক্রেটিস, হেরাডোটাসের শহরে এসে আক্ষরিক অর্থেই হারিয়ে গিয়েছিলাম।
সন্ধ্যায় হোটেল খুঁজে পেয়ে রুফটপ বারে বসে এক্রপলিসকে অন্ধকারে জ্বলজ্বল করতে দেখার আনন্দ- কেমন করে ভুলি?

পোল্যান্ডের গাদান্সক ফ্লাইটে করে গেলাম ওলগা তোকারচুক নামের প্রিয় পোলিশ লেখকের ‘ফ্লাইট’ বইয়ের কথা ভাবতে ভাবতে।
ওয়ারশ এয়ারপোর্ট স্পর্শ করতেই মন চনমন করে উঠলো- এই শহরেই জন্মেছিলেন দুনিয়ায় প্রথম ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রিতে নোবেলজয়ী মেরী কুরী!
আর কনফারেন্স গিয়ে আবিস্কার করলাম পোলিশ নোবেলজয়ী ভদ্রলোক লেখ ওয়ালেসা, কনফারেন্সের প্রধান অতিথি- মানে শহরের প্রধান এয়ারপোর্ট যার নামে, তাঁর সাথে দেখা হবে একথা কি ভেবেছি?

ডেনমার্কের বরফের মতো বাতাসে ভরা কোপেনহেগেনে পা দিয়েই মনে হয়েছে- এ তো হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের দেশ।
শৈশবে পড়া তার লেখা ‘কুচ্ছিত হাঁসছানা’র কথা মনে আছে আপনার? এই তাহলে সেই হাঁসছানার বাড়ি!
লং ড্রাইভে মাইলের পর মাইল গিয়ে বিশাল ফেরীতে করে অরহুস নামের আরেক শহরে গিয়ে বক্তৃতা দিয়েছি আর খুঁজে পেয়েছি একগাদা নতুন বন্ধু।

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস গেলাম। জর্জ সিমনোর কথা পড়ি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’তে। সিমনোর লেখা ক্রাইম ফিকশন পড়ে যে শিহরিত হলাম, সেই লোক বেলজিয়ামে জন্মেছিলেন!
পকেটে হাত দিয়ে দেখি, আমার জীবনের ফিকশন হিসেবে- ব্যাংক কার্ড ফেলে এসেছি প্যারিসে। পকেটে ফুটো পয়সা নেই, কিন্তু মনে আনন্দ, অথচ সাথে আমার কো-অর্ডিনেটর ম্যাগুলন ক্যাথালা না থাকলে কে আমাকে রক্ষা করতো তখন?

জার্মানির ফ্র‍্যাংকফুর্টে নেমেই বন্ধু আশিককে জড়িয়ে ধরেই মনে হয়েছিল- এরিক মারিয়া রেমার্ক, রাইনার মারিয়া রিলকে, হাইনরিখ হেনে কিংবা গুন্টার গ্রাসের ‘টিন ড্রাম’ বাজানো ছেলেটা- এদের জন্মস্থান তাহলে এই দেশ? কার্লমার্ক্স, হেগেল, নিতজের দেশ! এ কি স্বপ্ন?

ফ্রান্সের লিওন শহর আমি চিনতাম প্রিয় আতোঁয়ান সঁ এক্সুপেরির লেখা ‘লিটল প্রিন্স’ পড়ে। বইয়ের চমৎকার অনুবাদ করেছেন আমার প্রিয় আনন্দময়ী মজুমদার ওরফে আনন্দ দিদি।
এখন এই শহরে আমার নতুন বাসা থেকে বেরিয়ে কেবলকারে করে ফুভিয়ার নামের পাহাড়চূড়ায় বসে আল্পস পর্বতের দিকে তাকিয়ে কফি খেতে খেতে- আমি কাটিয়ে দিতে পারি আস্ত একটা দিন।

প্যারিস থেকে আসার আগে পুরো একটা দিন সেইনের পাড়ে বসে কানে হেডফোনে এডিথ পিয়াফের গাওয়া লা ভি অন রোজ শুনতে শুনতে আমি আবৃত্তি করেছি এই শহরে আমার দুই শতাব্দী আগে আসা মধুসূদন দত্তের কপোতাক্ষ নদ আর আমাদের প্রিয় জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’। সিমেট্রিতে গিয়ে অযথাই সিমন দ্যা ব্যুভোয়া আর সাখতের কবরের সামনে গিয়ে মেয়েদের সিঁদুর দেয়ার স্টাইলে কপালে ছুয়েছি ধুলো, প্যান্থিওনের আলো আঁধারিতে ভরা মাটির নিচের ক্রিপ্টে দেখেছি ভলতেয়ার‍, রুশো’র সমাধি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় প্যারিসের ইকোল দে বুজ আর্ট তৈরী হয়েছে ২০৬ বছর আগে- যে নিজেই একটা উপন্যাসের পাতা। অসংখ্য কিংবদন্তি শিল্পীর পায়ের ছাপে মুখরিত।

আমি জানি আমি জীবনে যত শহরে, বন্দরে যাবো কোথাও আমার একটুও একা লাগবেনা, কারণ আমার প্রিয় লেখক, শিল্পী আর দার্শনিকরা আমাকে পুরো পৃথিবী ঘুরিয়েছেন তাদের লেখার হাত ধরে। আমি আমার কল্পনায় অনেক আগেই কিলিমাঞ্জেরোর বরফ স্পর্শ করে সেইন্টপিটার্সবার্গের রাস্তায় আমার প্রিয় নায়কদের সাথে দেখা করেছি, আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস, টমাস হার্ডি কিংবা চার্লস ডিকেন্সের নায়কদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি লন্ডন, নরফোক, নটিংহ্যামের এ গলি ওগলিতে।

যদি আপনার মনে হয় এ খুবই সহজ, টাকা থাকলেই ঘুরে আসা যায় দেশ বিদেশ-তাহলে বেশ।
কেবল প্রিয় উপন্যাসের নায়কের মৃত্যুতে অথবা নায়িকার বিরহে বুকের ভেতর থেকে আসা পাতার মর্মরধ্বনির মতো সত্যিকারের কান্নাটা আমাকে একটাবার কেঁদে দেখান, কিংবা একটা বেলা ভাত না খেয়ে বুভুক্ষের মতো বইয়ের বাক্যগুলোকে খান- পারবেন তো?


জান্নাতুন নাঈম প্রীতি 

লেখক ও শিল্পী


 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

জাতীয় পুনর্গঠন কৌশল (National Reconstruction Strategies)

এসব আউট বই পড়ে কি হয়?

প্রকাশিত : ০৭:৪৩:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ মে ২০২৪

ক্লাস এইটে রেজাল্ট খারাপ হওয়া উপলক্ষে আমার স্কুলের হেডমাস্টার আপা আম্মুকে স্কুলে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন- আপনার মেয়ে সারাদিন কি করে? আম্মু কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললেন- বই পড়ে।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এসব আউট বই পড়ে কি হয়?
এখন থেকে বই আলমারিতে তুলে রাখবেন নাইলে মোম ঘষে রাখবেন।
আমার মা অপরাধীর মতো বললেন- জ্বি, আচ্ছা।

বাস্তবে তিনি সেটা করলেন না, শুধু বললেন- রেজাল্ট খারাপ করলে পরে খাবি কি? আমি খাওয়ার চিন্তায় পড়ালেখা দ্বিগুণ করলাম-মানে স্কুলের বইও গল্পের বইয়ের পাশাপাশি পড়া শুরু করলাম।

তখন ওই হেডমাস্টার আপাকে বলতে পারিনি। কিন্তু এখন আমি বলছি বই পড়ে কি হয়, প্লিজ মন দিয়ে পড়ুন।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখা ‘আ মুভেবল ফিস্ট’ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ পড়ে আমার স্বপ্ন ছিলো প্যারিস নামের শিল্পের শহরে থাকব অন্তত তিন মাস। জীবন আমাকে দিলো ওই শহরে শহরের মেয়রের আমন্ত্রণে দুই বছর, চমৎকার স্টুডিও এপার্টমেন্ট, যেখান থেকে এক কদম হাঁটলেই ভিক্টোর হুগো’র ‘দ্যা হ্যাঞ্চব্যাক অব নতরদাম’ বইয়ে লেখা সত্যিকারের নতরদাম ক্যাথিড্রাল!

ওটা থেকে আরেক কদম হাঁটলেই দুনিয়ার সবচেয়ে পুরাতন বইয়ের দোকান ‘শেক্সপিয়ার এন্ড কোম্পানি’। প্যারিসে বসে লেখা আমার একমাত্র বই ওই বইয়ের দোকানের রিডিংরুমে বসেই লেখা।

সেবা প্রকাশনীর অনুবাদে ‘স্বপ্নসখা’ নামের একটা বই ছিলো ভিক্তরিয়া হল্টের লেখা। আসল নাম- ‘অন দ্যা নাইট অব সেভেন্থ মুন’। সেই বইয়ের পটভূমি ছিলো জার্মানির ব্ল্যাকফরেস্ট, যেখানের ব্ল্যাকফরেস্ট কেক ভুবন বিখ্যাত।
অথবা গ্রীম ভাইদের রূপকথার ‘হ্যানসেল গ্রেটেল’, ওদের জন্মও ব্ল্যাকফরেস্টেই।
একদিন জানলাম আমার বন্ধু তাসলিমা খানম আপা থাকেন ব্ল্যাকফরেস্টের মধ্যেকার ছবির মতো শহর ফ্রয়ডেন্সটাডে। এখন গ্রীষ্ম কিংবা বসন্ত, যখনই মন চায়, তখনই দেই ছুট!

অসলো’র আমন্ত্রণ যেদিন এলো সেদিন কাকতালীয়ভাবে মুরাকামির ‘নরওয়েজিয়ান উড’- সবে কিনলাম, উপন্যাসের পটভূমি টোকিও যদিও। তখনও জানতাম না এখন যিনি নরওয়ের নোবেল প্রাইজ কমিটির হেড- তিনিই আমন্ত্রণ জানাবেন ওই শহর ছুঁয়ে উটোয়া নামক দ্বীপে দুনিয়ার ৫০টা দেশের ৫০ জন ইয়াং লিডারের একজন হিসেবে।
ফিয়র্ডের জলে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ওদের কিংবদন্তি ইবসেনের ‘ডলস হাউস’ আর ন্যুট হামশুনের ভ্যাগাবন্ড, যার বাংলা সংস্করণ ‘হিমু’ লিখেছিলেন আমাদের হুমায়ূন আহমেদ, সেকথা ভেবেই মুচকি হাসি ফুটে উঠলো- সেই দেশ চিনতে আর কি লাগে?

গ্রীসের সেই কবি হোমার, যার লেখা ইলিয়াড আর ওডেসি না পড়লে গ্রীক পুরাণের হেলেন, এথেনাদের চেনা যায়না, সেই স্মৃতির নস্টালজিয়ায় দীর্ঘদিন আছন্ন ছিলাম।কিন্তু ওদেশের এথেন্সের কথা পড়েছিলাম প্রথম ইতিহাস বইতে।
কনফারেন্সে এসে নিজের পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে প্লেটো, এরিস্টটল, সক্রেটিস, হেরাডোটাসের শহরে এসে আক্ষরিক অর্থেই হারিয়ে গিয়েছিলাম।
সন্ধ্যায় হোটেল খুঁজে পেয়ে রুফটপ বারে বসে এক্রপলিসকে অন্ধকারে জ্বলজ্বল করতে দেখার আনন্দ- কেমন করে ভুলি?

পোল্যান্ডের গাদান্সক ফ্লাইটে করে গেলাম ওলগা তোকারচুক নামের প্রিয় পোলিশ লেখকের ‘ফ্লাইট’ বইয়ের কথা ভাবতে ভাবতে।
ওয়ারশ এয়ারপোর্ট স্পর্শ করতেই মন চনমন করে উঠলো- এই শহরেই জন্মেছিলেন দুনিয়ায় প্রথম ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রিতে নোবেলজয়ী মেরী কুরী!
আর কনফারেন্স গিয়ে আবিস্কার করলাম পোলিশ নোবেলজয়ী ভদ্রলোক লেখ ওয়ালেসা, কনফারেন্সের প্রধান অতিথি- মানে শহরের প্রধান এয়ারপোর্ট যার নামে, তাঁর সাথে দেখা হবে একথা কি ভেবেছি?

ডেনমার্কের বরফের মতো বাতাসে ভরা কোপেনহেগেনে পা দিয়েই মনে হয়েছে- এ তো হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের দেশ।
শৈশবে পড়া তার লেখা ‘কুচ্ছিত হাঁসছানা’র কথা মনে আছে আপনার? এই তাহলে সেই হাঁসছানার বাড়ি!
লং ড্রাইভে মাইলের পর মাইল গিয়ে বিশাল ফেরীতে করে অরহুস নামের আরেক শহরে গিয়ে বক্তৃতা দিয়েছি আর খুঁজে পেয়েছি একগাদা নতুন বন্ধু।

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস গেলাম। জর্জ সিমনোর কথা পড়ি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’তে। সিমনোর লেখা ক্রাইম ফিকশন পড়ে যে শিহরিত হলাম, সেই লোক বেলজিয়ামে জন্মেছিলেন!
পকেটে হাত দিয়ে দেখি, আমার জীবনের ফিকশন হিসেবে- ব্যাংক কার্ড ফেলে এসেছি প্যারিসে। পকেটে ফুটো পয়সা নেই, কিন্তু মনে আনন্দ, অথচ সাথে আমার কো-অর্ডিনেটর ম্যাগুলন ক্যাথালা না থাকলে কে আমাকে রক্ষা করতো তখন?

জার্মানির ফ্র‍্যাংকফুর্টে নেমেই বন্ধু আশিককে জড়িয়ে ধরেই মনে হয়েছিল- এরিক মারিয়া রেমার্ক, রাইনার মারিয়া রিলকে, হাইনরিখ হেনে কিংবা গুন্টার গ্রাসের ‘টিন ড্রাম’ বাজানো ছেলেটা- এদের জন্মস্থান তাহলে এই দেশ? কার্লমার্ক্স, হেগেল, নিতজের দেশ! এ কি স্বপ্ন?

ফ্রান্সের লিওন শহর আমি চিনতাম প্রিয় আতোঁয়ান সঁ এক্সুপেরির লেখা ‘লিটল প্রিন্স’ পড়ে। বইয়ের চমৎকার অনুবাদ করেছেন আমার প্রিয় আনন্দময়ী মজুমদার ওরফে আনন্দ দিদি।
এখন এই শহরে আমার নতুন বাসা থেকে বেরিয়ে কেবলকারে করে ফুভিয়ার নামের পাহাড়চূড়ায় বসে আল্পস পর্বতের দিকে তাকিয়ে কফি খেতে খেতে- আমি কাটিয়ে দিতে পারি আস্ত একটা দিন।

প্যারিস থেকে আসার আগে পুরো একটা দিন সেইনের পাড়ে বসে কানে হেডফোনে এডিথ পিয়াফের গাওয়া লা ভি অন রোজ শুনতে শুনতে আমি আবৃত্তি করেছি এই শহরে আমার দুই শতাব্দী আগে আসা মধুসূদন দত্তের কপোতাক্ষ নদ আর আমাদের প্রিয় জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’। সিমেট্রিতে গিয়ে অযথাই সিমন দ্যা ব্যুভোয়া আর সাখতের কবরের সামনে গিয়ে মেয়েদের সিঁদুর দেয়ার স্টাইলে কপালে ছুয়েছি ধুলো, প্যান্থিওনের আলো আঁধারিতে ভরা মাটির নিচের ক্রিপ্টে দেখেছি ভলতেয়ার‍, রুশো’র সমাধি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় প্যারিসের ইকোল দে বুজ আর্ট তৈরী হয়েছে ২০৬ বছর আগে- যে নিজেই একটা উপন্যাসের পাতা। অসংখ্য কিংবদন্তি শিল্পীর পায়ের ছাপে মুখরিত।

আমি জানি আমি জীবনে যত শহরে, বন্দরে যাবো কোথাও আমার একটুও একা লাগবেনা, কারণ আমার প্রিয় লেখক, শিল্পী আর দার্শনিকরা আমাকে পুরো পৃথিবী ঘুরিয়েছেন তাদের লেখার হাত ধরে। আমি আমার কল্পনায় অনেক আগেই কিলিমাঞ্জেরোর বরফ স্পর্শ করে সেইন্টপিটার্সবার্গের রাস্তায় আমার প্রিয় নায়কদের সাথে দেখা করেছি, আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস, টমাস হার্ডি কিংবা চার্লস ডিকেন্সের নায়কদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি লন্ডন, নরফোক, নটিংহ্যামের এ গলি ওগলিতে।

যদি আপনার মনে হয় এ খুবই সহজ, টাকা থাকলেই ঘুরে আসা যায় দেশ বিদেশ-তাহলে বেশ।
কেবল প্রিয় উপন্যাসের নায়কের মৃত্যুতে অথবা নায়িকার বিরহে বুকের ভেতর থেকে আসা পাতার মর্মরধ্বনির মতো সত্যিকারের কান্নাটা আমাকে একটাবার কেঁদে দেখান, কিংবা একটা বেলা ভাত না খেয়ে বুভুক্ষের মতো বইয়ের বাক্যগুলোকে খান- পারবেন তো?


জান্নাতুন নাঈম প্রীতি 

লেখক ও শিল্পী