০৯:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

নেতৃত্বের মঞ্চে ছাত্র উপদেষ্টাদের স্ট্যান্ড বাজি—নির্যাতিত হলেও বিএনপি’র নৈতিক অবস্থান ছিল ভিন্ন

  • গাজী সাইফুল
  • প্রকাশিত : ০২:৫৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • 939

বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্ । ছবি: সংগৃহীত


২০২৪ সালের ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই—এই তিন দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ ছয়জনকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়।

হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, যা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করে। এরপর, ২৮ জুলাই রাতে, ডিবি কার্যালয় থেকে এক ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলনের সব কর্মসূচি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সমন্বয়করা লিখিত বার্তা পাঠ করে শোনান, যেখানে আন্দোলন স্থগিতের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি স্পষ্ট যে হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়, যা তাদের আন্দোলন প্রত্যাহারে বাধ্য করে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজত থেকেই সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ক। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই, মেট্রোরেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আবু হান্নানসহ চারজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিখোঁজ হন। তারা হলেন—আবু হান্নান, যুগ্ম সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি, ইমাম আল নাসের (মিশুক), সাধারণ সম্পাদক, শহীদুল্লাহ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বজলুল রহমান (বিজয়), সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, বিজয় একাত্তর হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মো. ফেরদৌস (রুবেল), সহ-সভাপতি, ছাত্রদল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

মেট্রোরেলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ছাত্রদলের চার নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের কোথায় রাখা হয়েছে, কেমন অবস্থায় আছেন—এ বিষয়ে পরিবারের কেউ কোনো তথ্য পাননি। অবশেষে, ২৮ জুলাই, চার নেতাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয ।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে ছাত্রদল নেতাদের জন্য এক বিভীষিকাময় অধ্যায় শুরু হয়। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাইফুল ইসলাম নীরব, রফিকুল ইসলাম মজনু ও আমিনুল হকসহ অন্যান্য নেতাদের গ্রেপ্তার করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তবে স্বাভাবিক গ্রেপ্তারের চেয়ে এটি ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

ডিবি কার্যালয়ে প্রবেশের এক-দেড় মিনিটের মধ্যেই প্রত্যেককে ২-৩ জন পুলিশের কাঁধে তুলে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়—যেন তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন। পরে জানা যায়, ভয়ংকর শারীরিক নির্যাতন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা এবং চরম মানসিক নিপীড়নের পর এ অবস্থায় তাদের আনা হয়েছিল। এত বড় নেতাদের এমন নিথর, অসহায় ও বিপর্যস্ত চেহারা দেখে দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরা তখনই বুঝে যান, তাদের অনাগত ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।

এরপর শুরু হয় নৃশংস নির্যাতনের আরও ভয়াবহ রূপ। জম টুপি পরিয়ে শরীরকে নিথর ও সংজ্ঞাহীন করে ফেলা হতো। নির্যাতন ছিল এতটাই নির্মম যে তাদের প্রায় মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। নির্যাতনকারীদের মধ্যে তখন সিদ্ধান্ত হয়—তাদের হত্যা করে তুরাগ নদী বা যাত্রাবাড়ীর কোনো জায়গায় ফেলে দেওয়া হবে।

কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, এবং অবশেষে তারা ৬ আগস্ট ২০২৪ সালে বেঁচে ফিরে আসেন।

নির্যাতনের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মেট্রোরেলে আগুন দেওয়ার দায় স্বীকার করানো এবং বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নাম বের করে আনা। কিন্তু অকল্পনীয় নিপীড়নের মুখেও এই নেতারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, সত্যের ওপর অবিচল থেকেছেন।

জুলাই আন্দোলনের সময় শুধু নাহিদ নয়, আরও অনেক সাহসী ছাত্রনেতা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেনও তেমনই একজন। তাকেও গুম করে রেখে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছিল, যার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল প্রকাশিত ছবিতে। সাজ্জাদের নির্যাতনের চিত্র দেখে যে কেউ স্তব্ধ হয়ে যায়—জখমে ঢাকা শরীর, চোখে অমানুষিক কষ্টের ছাপ।

ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন ও ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদের উপর পুলিশের বর্বর নির্যাতনের চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

নাহিদের ছবির সঙ্গে সাজ্জাদের ছবির এক ধরনের মিল পাওয়া গেলেও, সাজ্জাদের ওপর চালানো নির্মমতা ছিল আরও ভয়ংকর। কিন্তু এই নির্যাতন, এই নিপীড়ন, এই অমানবিকতার পরও তারা মাথা নত করেননি, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি।

জুলাই আন্দোলনের সেই স্মরণীয় দৃশ্য—আদালত চত্বরে হ্যান্ডকাফ পরিহিত ছেলেকে পিঠে হাত চাপড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন মা। এই মুহূর্তটি শুধু একটি মা-ছেলের ভালোবাসার ছবি নয়, এটি হাজারও সন্তান ও মায়ের অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই সন্তান ইমরান সানিয়াত, যিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, লড়াই চালিয়ে গেছেন।

কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সীমাহীন নির্যাতন। ইমরান সানিয়াতের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম অত্যাচার। শুধু তিনিই নন, তার পরিবারও এই নিপীড়নের বাইরে যেতে পারেনি। তার বাবা বরকতউল্লাহ বুলু—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, এবং তার মা, যিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল ছাত্রদলের (১৯৮০-৮২) সাংস্কৃতিক সম্পাদক—তারাও ভয়ংকর দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু বর্বরতম নির্যাতন, নিপীড়ন, কারাবরণ—কোনো কিছুই তাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, মাথা নত করেননি।

গত ১৭ বছরে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের অসংখ্য নেতা-কর্মী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—কেউ ফিরে এসেছেন গুরুতর জখম নিয়ে, কেউ আর ফিরে আসেননি। তবু তারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, মাথা নত করেননি।

ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামান জনির বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল ৫৬টি গুলিতে—শুধু নিশ্চিত করতে, যেন তিনি আর বেঁচে না থাকেন। চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নূরকে হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেই ভয়াবহ দৃশ্য আজও মনে পড়ে, যা শুধু একটি প্রাণ নিভিয়ে দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং একটি আদর্শকে দমিয়ে রাখার হীন প্রচেষ্টা ছিল।

ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামান জনি ও ছাত্রদল নেতা নুরুল আলমের হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাত। ছবি: সংগৃহীত

তবে ইতিহাস সাক্ষী, লাশের স্তূপ গড়ে হলেও অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করেননি তারা। বরং তাদের আত্মত্যাগ হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের প্রতীক, সংগ্রামের প্রেরণা।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির ৭০ উর্ধ্ব বহু সিনিয়র নেতাকে মাসের পর মাস কারাবন্দি রেখে ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার করা হয়েছে। বয়সের ভার, অসুস্থতা—কিছুই বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তবু তারা নতি স্বীকার করেননি, অন্যায়ের সাথে আপস করেননি।

গত ১৭ বছরের আন্দোলনে আপনাদের কাউকে পাশে পাইনি—না ছাত্র, না সুশীল সমাজ, না সাংস্কৃতিক কর্মী, না শিক্ষক, না সাংবাদিক। উল্টো আপনারাই বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন, কখনো জঙ্গি তকমা দেওয়া হয়েছে, কখনো আগুন সন্ত্রাসের অপবাদ দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে।

আজ আবার সেই  আপনারাই—একই রূপে, একই সুরে—অপ্রাসঙ্গিক  তুলছেন, গত ১৭ বছরে বিএনপি কী করেছে?

বিএনপি আপোষ করেনি, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মাথা নত করেনি। সমমনা ছোট ছোট কিছু দলকে সঙ্গে নিয়ে সীমাহীন নিপীড়নের মধ্যেও গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের জন্য লড়ে গেছে। এই লড়াই ছিল কঠিন, বন্ধুর, কিন্তু বিএনপি কখনো পথ হারায়নি, কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা ঝুঁকায়নি। ইতিহাস একদিন সত্যের স্বীকৃতি দেবে—কারা লড়াই করেছে, আর কারা শুধু প্রশ্ন তুলেছে।

প্রতিটি আন্দোলনে বিএনপি ছিল—সর্বাত্মক সমর্থন, সহযোগিতা, ও অংশগ্রহণ নিয়ে। যখনই গণতান্ত্রিক অধিকার বা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই হয়েছে, বিএনপি ছিল পাশে, রাজপথে, সম্মুখসারিতে।

অথচ ১৮ জুলাইয়ের পর, যখন আন্দোলন সমন্বয়কারীরা ধীরে ধীরে আন্দোলন স্থগিত করে দেয়, তখনও বিএনপি পিছু হটেনি। বরং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন—”তারা আমাদের সন্তানদের রাজপথে হত্যা করছে। হাসিনার পতনের আন্দোলনে সর্বশক্তি দিয়ে চূড়ান্তভাবে মাঠে নামুন। আজ থেকে, এখন থেকে।” এই ডাক ছিল আপোষহীন প্রতিরোধে ।

এখানেই শেষ নয়। ১৬ ও ১৮ জুলাই তারেক রহমান দলের নেতা-কর্মী এবং জনগণকে আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি জানিয়ে দেন, জনগণের সংগ্রাম থামবে না, এবং সকলকে রাজপথে নেমে হাসিনার পতনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এরপর, ২৮ জুলাই যখন নাহিদ ইসলাম আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন, তখনও তারেক রহমান এক মুহূর্তের জন্য পিছু হটেননি। ১ আগস্ট ২০২৪ তিনি পুনরায় ঘোষণা দেন “এক দফা”—শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি। এই ঘোষণায়, তিনি নেতা-কর্মী এবং জনগণকে কোনও ধরণের নির্দেশনা ছাড়াই প্রেরণা জুগিয়ে বলেন, “যদি একজন গ্রেফতার হয়, অন্যজন নেতৃত্ব নেবে।”

দেশবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণের আহবান জানান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

তার পরবর্তী ঘোষণায় তিনি আরও বলেন, “দফা এক দাবি এক: শেখ হাসিনার পদত্যাগ।” ৪ আগস্ট, তারেক রহমান আবারও বার্তা দেন—“প্রিয় দেশবাসী, ছাত্রদের ডাকে সাড়া দিয়ে যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে রাজপথে নেমে আসুন, প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।” তিনি সেনাবাহিনীকে আহ্বান জানান—”দেশপ্রেমিক” শব্দটির মর্যাদা রক্ষা করে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার জন্য।

বিএনপি এই আন্দোলনে একটি চমৎকার কৌশল প্রয়োগ করে, যা ছিল স্বৈরাচারের সবচেয়ে শক্তিশালী দানব—পুলিশ বাহিনীকে সঠিকভাবে দুর্বল এবং ডিমোরালাইজড করার। তবে, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কখনোই তারা এর প্রকৃত বাস্তবতা জনসম্মুখে তুলে ধরতে পারবে না, কারণ এটি ছিল তাদের কৌশলগত নিরবতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অংশ।

বিএনপি জানে, এই বিষয়টি যদি প্রকাশিত হয়, তবে তা তাদের গণতান্ত্রিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, কারণ তারা একটি লিবারেল রাজনৈতিক শক্তি, যা জনসমর্থন ও নৈতিকতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে। যদিও, “বিটউইন দ্যা লাইন্স”—যার অর্থ হচ্ছে, যারা চিন্তাশীল ও বিবেকবান, তারা এই বাস্তবতা সহজেই বুঝতে পারবে।

এটি গভীর রাজনৈতিক কৌশল, যা দলের অভ্যন্তরীণ গতিবিধি ও লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজন ছিল, তবে তার একক কৃতিত্ব নেওয়া বা স্বার্থ হাসিল করার জন্য তা কখনোই প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি।

দলীয় একটি সূত্র নিশ্চিত করে, তারেক রহমান তারেক রহমান সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে গোপনীয়তার সাথে দলীয় নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব দেন; যা শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ মহল জানত। তারেক রহমানের কাছের সহযোগী ছাড়া কেউই জানতেন না কোথায়, কিভাবে এবং কারা এই মিশন সফল করতে নিয়োজিত ছিল। এমনকি লন্ডনে বিএনপি নেতা, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বা মধ্যম সারির নেতারাও এসব বিষয়ে অবগত ছিলেন না, কারণ অতীতে কিছু নেতার বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান  ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন।

তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কখনোই এই সফলতার কৃতিত্ব নিজের কাছে দাবি করেননি। বরং, তিনি সবসময় ছাত্রদের উৎসাহিত করেছেন এবং তাদের প্রশংসা করেছেন, তাদের ত্যাগ ও সাহসিকতাকেই প্রধান হিসেবে তুলে ধরেছেন। যখন সমন্বয়করা বিএনপি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ঐদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করছিলেন, তিনি কখনোই এর প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তিনি বরং ছাত্রদের কাছে তাদের সংগ্রামের কৃতিত্ব রাখার মাধ্যমে তাদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।

এই নিরবতা ও আত্মসমর্পণ তার নেতৃত্বের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে দলের স্বার্থ ও ছাত্রদের প্রচেষ্টার গুরুত্ব সর্বোচ্চ।

রাজনৈতিক মাঠে আজকের পরিস্থিতি একেবারেই সহজ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নেতা-কর্মী এবং বিভিন্ন উপদেষ্টা ও সুশীলদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক পার্থক্য ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। সমন্বয়কদের কথায় বিতর্ক থাকলেও, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সেই সব উপদেষ্টা এবং সুশীলরা, যারা বৈষম্যহীনতার কথা বলে বিজয়ের গৌরবকে নিজের ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। যদিও তারা সবার কাছে দাবি করছেন একতা এবং সম্মান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি এই ছাত্রনেতাদের  ভিন্ন রূপ দেখা গেলে, এমন পরিস্থিতি  দেশ এবং জনগণের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

এটি একেবারেই খোলাসা যে, কোনো একক ব্যক্তির অবদানকে খাটো করার প্রবণতা দলীয় ঐক্য ও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। “আজ আমি আপনাকে বাদ দিব, কাল আপনি আমাকে বাদ দিবেন”—এই মন্ত্র যদি রাজনীতির মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রাজনৈতিক শক্তি কখনোই সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারবে না।

বিশেষভাবে, নাহিদ ইসলাম এবং সাজ্জাদ হোসেনের মত নেতাদের নৈতিকতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমেই। তাদের অবদানকে মূল্যায়ন না করে কোনো নেতৃবৃন্দ যদি তাদের প্রতিহত করে, তবে দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরও তীব্র হতে পারে। যেহেতু তারা শুধু দলের নয়, বরং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতীক হিসেবে নিজেদের পরিচিত করেছেন, তাই তাদের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দলীয় ঐক্য বজায় রেখে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, বিএনপির নেতারা যে কোন ধরনের বিভাজন ও আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে একটি সুসংহত রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করবে—এটিই বিএনপি’র ভবিষ্যত পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

জনপ্রিয়

জাতীয় পুনর্গঠন কৌশল (National Reconstruction Strategies)

নেতৃত্বের মঞ্চে ছাত্র উপদেষ্টাদের স্ট্যান্ড বাজি—নির্যাতিত হলেও বিএনপি’র নৈতিক অবস্থান ছিল ভিন্ন

প্রকাশিত : ০২:৫৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

২০২৪ সালের ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই—এই তিন দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ ছয়জনকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়।

হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, যা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করে। এরপর, ২৮ জুলাই রাতে, ডিবি কার্যালয় থেকে এক ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলনের সব কর্মসূচি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সমন্বয়করা লিখিত বার্তা পাঠ করে শোনান, যেখানে আন্দোলন স্থগিতের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি স্পষ্ট যে হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়, যা তাদের আন্দোলন প্রত্যাহারে বাধ্য করে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজত থেকেই সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ক। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ২৪ জুলাই, মেট্রোরেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আবু হান্নানসহ চারজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিখোঁজ হন। তারা হলেন—আবু হান্নান, যুগ্ম সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি, ইমাম আল নাসের (মিশুক), সাধারণ সম্পাদক, শহীদুল্লাহ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বজলুল রহমান (বিজয়), সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, বিজয় একাত্তর হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মো. ফেরদৌস (রুবেল), সহ-সভাপতি, ছাত্রদল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

মেট্রোরেলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ছাত্রদলের চার নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের কোথায় রাখা হয়েছে, কেমন অবস্থায় আছেন—এ বিষয়ে পরিবারের কেউ কোনো তথ্য পাননি। অবশেষে, ২৮ জুলাই, চার নেতাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয ।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে ছাত্রদল নেতাদের জন্য এক বিভীষিকাময় অধ্যায় শুরু হয়। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাইফুল ইসলাম নীরব, রফিকুল ইসলাম মজনু ও আমিনুল হকসহ অন্যান্য নেতাদের গ্রেপ্তার করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তবে স্বাভাবিক গ্রেপ্তারের চেয়ে এটি ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

ডিবি কার্যালয়ে প্রবেশের এক-দেড় মিনিটের মধ্যেই প্রত্যেককে ২-৩ জন পুলিশের কাঁধে তুলে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়—যেন তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন। পরে জানা যায়, ভয়ংকর শারীরিক নির্যাতন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা এবং চরম মানসিক নিপীড়নের পর এ অবস্থায় তাদের আনা হয়েছিল। এত বড় নেতাদের এমন নিথর, অসহায় ও বিপর্যস্ত চেহারা দেখে দলের অন্যান্য নেতাকর্মীরা তখনই বুঝে যান, তাদের অনাগত ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।

এরপর শুরু হয় নৃশংস নির্যাতনের আরও ভয়াবহ রূপ। জম টুপি পরিয়ে শরীরকে নিথর ও সংজ্ঞাহীন করে ফেলা হতো। নির্যাতন ছিল এতটাই নির্মম যে তাদের প্রায় মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। নির্যাতনকারীদের মধ্যে তখন সিদ্ধান্ত হয়—তাদের হত্যা করে তুরাগ নদী বা যাত্রাবাড়ীর কোনো জায়গায় ফেলে দেওয়া হবে।

কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, এবং অবশেষে তারা ৬ আগস্ট ২০২৪ সালে বেঁচে ফিরে আসেন।

নির্যাতনের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মেট্রোরেলে আগুন দেওয়ার দায় স্বীকার করানো এবং বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নাম বের করে আনা। কিন্তু অকল্পনীয় নিপীড়নের মুখেও এই নেতারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, সত্যের ওপর অবিচল থেকেছেন।

জুলাই আন্দোলনের সময় শুধু নাহিদ নয়, আরও অনেক সাহসী ছাত্রনেতা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেনও তেমনই একজন। তাকেও গুম করে রেখে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছিল, যার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল প্রকাশিত ছবিতে। সাজ্জাদের নির্যাতনের চিত্র দেখে যে কেউ স্তব্ধ হয়ে যায়—জখমে ঢাকা শরীর, চোখে অমানুষিক কষ্টের ছাপ।

ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসেন ও ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদের উপর পুলিশের বর্বর নির্যাতনের চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

নাহিদের ছবির সঙ্গে সাজ্জাদের ছবির এক ধরনের মিল পাওয়া গেলেও, সাজ্জাদের ওপর চালানো নির্মমতা ছিল আরও ভয়ংকর। কিন্তু এই নির্যাতন, এই নিপীড়ন, এই অমানবিকতার পরও তারা মাথা নত করেননি, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি।

জুলাই আন্দোলনের সেই স্মরণীয় দৃশ্য—আদালত চত্বরে হ্যান্ডকাফ পরিহিত ছেলেকে পিঠে হাত চাপড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন মা। এই মুহূর্তটি শুধু একটি মা-ছেলের ভালোবাসার ছবি নয়, এটি হাজারও সন্তান ও মায়ের অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই সন্তান ইমরান সানিয়াত, যিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, লড়াই চালিয়ে গেছেন।

কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সীমাহীন নির্যাতন। ইমরান সানিয়াতের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম অত্যাচার। শুধু তিনিই নন, তার পরিবারও এই নিপীড়নের বাইরে যেতে পারেনি। তার বাবা বরকতউল্লাহ বুলু—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, এবং তার মা, যিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল ছাত্রদলের (১৯৮০-৮২) সাংস্কৃতিক সম্পাদক—তারাও ভয়ংকর দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু বর্বরতম নির্যাতন, নিপীড়ন, কারাবরণ—কোনো কিছুই তাদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, মাথা নত করেননি।

গত ১৭ বছরে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের অসংখ্য নেতা-কর্মী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—কেউ ফিরে এসেছেন গুরুতর জখম নিয়ে, কেউ আর ফিরে আসেননি। তবু তারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, মাথা নত করেননি।

ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামান জনির বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল ৫৬টি গুলিতে—শুধু নিশ্চিত করতে, যেন তিনি আর বেঁচে না থাকেন। চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নূরকে হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেই ভয়াবহ দৃশ্য আজও মনে পড়ে, যা শুধু একটি প্রাণ নিভিয়ে দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং একটি আদর্শকে দমিয়ে রাখার হীন প্রচেষ্টা ছিল।

ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামান জনি ও ছাত্রদল নেতা নুরুল আলমের হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাত। ছবি: সংগৃহীত

তবে ইতিহাস সাক্ষী, লাশের স্তূপ গড়ে হলেও অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করেননি তারা। বরং তাদের আত্মত্যাগ হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের প্রতীক, সংগ্রামের প্রেরণা।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির ৭০ উর্ধ্ব বহু সিনিয়র নেতাকে মাসের পর মাস কারাবন্দি রেখে ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার করা হয়েছে। বয়সের ভার, অসুস্থতা—কিছুই বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তবু তারা নতি স্বীকার করেননি, অন্যায়ের সাথে আপস করেননি।

গত ১৭ বছরের আন্দোলনে আপনাদের কাউকে পাশে পাইনি—না ছাত্র, না সুশীল সমাজ, না সাংস্কৃতিক কর্মী, না শিক্ষক, না সাংবাদিক। উল্টো আপনারাই বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন, কখনো জঙ্গি তকমা দেওয়া হয়েছে, কখনো আগুন সন্ত্রাসের অপবাদ দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে।

আজ আবার সেই  আপনারাই—একই রূপে, একই সুরে—অপ্রাসঙ্গিক  তুলছেন, গত ১৭ বছরে বিএনপি কী করেছে?

বিএনপি আপোষ করেনি, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মাথা নত করেনি। সমমনা ছোট ছোট কিছু দলকে সঙ্গে নিয়ে সীমাহীন নিপীড়নের মধ্যেও গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের জন্য লড়ে গেছে। এই লড়াই ছিল কঠিন, বন্ধুর, কিন্তু বিএনপি কখনো পথ হারায়নি, কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা ঝুঁকায়নি। ইতিহাস একদিন সত্যের স্বীকৃতি দেবে—কারা লড়াই করেছে, আর কারা শুধু প্রশ্ন তুলেছে।

প্রতিটি আন্দোলনে বিএনপি ছিল—সর্বাত্মক সমর্থন, সহযোগিতা, ও অংশগ্রহণ নিয়ে। যখনই গণতান্ত্রিক অধিকার বা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই হয়েছে, বিএনপি ছিল পাশে, রাজপথে, সম্মুখসারিতে।

অথচ ১৮ জুলাইয়ের পর, যখন আন্দোলন সমন্বয়কারীরা ধীরে ধীরে আন্দোলন স্থগিত করে দেয়, তখনও বিএনপি পিছু হটেনি। বরং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন—”তারা আমাদের সন্তানদের রাজপথে হত্যা করছে। হাসিনার পতনের আন্দোলনে সর্বশক্তি দিয়ে চূড়ান্তভাবে মাঠে নামুন। আজ থেকে, এখন থেকে।” এই ডাক ছিল আপোষহীন প্রতিরোধে ।

এখানেই শেষ নয়। ১৬ ও ১৮ জুলাই তারেক রহমান দলের নেতা-কর্মী এবং জনগণকে আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি জানিয়ে দেন, জনগণের সংগ্রাম থামবে না, এবং সকলকে রাজপথে নেমে হাসিনার পতনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এরপর, ২৮ জুলাই যখন নাহিদ ইসলাম আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন, তখনও তারেক রহমান এক মুহূর্তের জন্য পিছু হটেননি। ১ আগস্ট ২০২৪ তিনি পুনরায় ঘোষণা দেন “এক দফা”—শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি। এই ঘোষণায়, তিনি নেতা-কর্মী এবং জনগণকে কোনও ধরণের নির্দেশনা ছাড়াই প্রেরণা জুগিয়ে বলেন, “যদি একজন গ্রেফতার হয়, অন্যজন নেতৃত্ব নেবে।”

দেশবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণের আহবান জানান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

তার পরবর্তী ঘোষণায় তিনি আরও বলেন, “দফা এক দাবি এক: শেখ হাসিনার পদত্যাগ।” ৪ আগস্ট, তারেক রহমান আবারও বার্তা দেন—“প্রিয় দেশবাসী, ছাত্রদের ডাকে সাড়া দিয়ে যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে রাজপথে নেমে আসুন, প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।” তিনি সেনাবাহিনীকে আহ্বান জানান—”দেশপ্রেমিক” শব্দটির মর্যাদা রক্ষা করে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার জন্য।

বিএনপি এই আন্দোলনে একটি চমৎকার কৌশল প্রয়োগ করে, যা ছিল স্বৈরাচারের সবচেয়ে শক্তিশালী দানব—পুলিশ বাহিনীকে সঠিকভাবে দুর্বল এবং ডিমোরালাইজড করার। তবে, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কখনোই তারা এর প্রকৃত বাস্তবতা জনসম্মুখে তুলে ধরতে পারবে না, কারণ এটি ছিল তাদের কৌশলগত নিরবতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অংশ।

বিএনপি জানে, এই বিষয়টি যদি প্রকাশিত হয়, তবে তা তাদের গণতান্ত্রিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, কারণ তারা একটি লিবারেল রাজনৈতিক শক্তি, যা জনসমর্থন ও নৈতিকতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে। যদিও, “বিটউইন দ্যা লাইন্স”—যার অর্থ হচ্ছে, যারা চিন্তাশীল ও বিবেকবান, তারা এই বাস্তবতা সহজেই বুঝতে পারবে।

এটি গভীর রাজনৈতিক কৌশল, যা দলের অভ্যন্তরীণ গতিবিধি ও লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজন ছিল, তবে তার একক কৃতিত্ব নেওয়া বা স্বার্থ হাসিল করার জন্য তা কখনোই প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি।

দলীয় একটি সূত্র নিশ্চিত করে, তারেক রহমান তারেক রহমান সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে গোপনীয়তার সাথে দলীয় নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব দেন; যা শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ মহল জানত। তারেক রহমানের কাছের সহযোগী ছাড়া কেউই জানতেন না কোথায়, কিভাবে এবং কারা এই মিশন সফল করতে নিয়োজিত ছিল। এমনকি লন্ডনে বিএনপি নেতা, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বা মধ্যম সারির নেতারাও এসব বিষয়ে অবগত ছিলেন না, কারণ অতীতে কিছু নেতার বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান  ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন।

তবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কখনোই এই সফলতার কৃতিত্ব নিজের কাছে দাবি করেননি। বরং, তিনি সবসময় ছাত্রদের উৎসাহিত করেছেন এবং তাদের প্রশংসা করেছেন, তাদের ত্যাগ ও সাহসিকতাকেই প্রধান হিসেবে তুলে ধরেছেন। যখন সমন্বয়করা বিএনপি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ঐদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করছিলেন, তিনি কখনোই এর প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তিনি বরং ছাত্রদের কাছে তাদের সংগ্রামের কৃতিত্ব রাখার মাধ্যমে তাদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন।

এই নিরবতা ও আত্মসমর্পণ তার নেতৃত্বের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে দলের স্বার্থ ও ছাত্রদের প্রচেষ্টার গুরুত্ব সর্বোচ্চ।

রাজনৈতিক মাঠে আজকের পরিস্থিতি একেবারেই সহজ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির নেতা-কর্মী এবং বিভিন্ন উপদেষ্টা ও সুশীলদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক পার্থক্য ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। সমন্বয়কদের কথায় বিতর্ক থাকলেও, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সেই সব উপদেষ্টা এবং সুশীলরা, যারা বৈষম্যহীনতার কথা বলে বিজয়ের গৌরবকে নিজের ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। যদিও তারা সবার কাছে দাবি করছেন একতা এবং সম্মান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি এই ছাত্রনেতাদের  ভিন্ন রূপ দেখা গেলে, এমন পরিস্থিতি  দেশ এবং জনগণের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

এটি একেবারেই খোলাসা যে, কোনো একক ব্যক্তির অবদানকে খাটো করার প্রবণতা দলীয় ঐক্য ও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। “আজ আমি আপনাকে বাদ দিব, কাল আপনি আমাকে বাদ দিবেন”—এই মন্ত্র যদি রাজনীতির মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রাজনৈতিক শক্তি কখনোই সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারবে না।

বিশেষভাবে, নাহিদ ইসলাম এবং সাজ্জাদ হোসেনের মত নেতাদের নৈতিকতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমেই। তাদের অবদানকে মূল্যায়ন না করে কোনো নেতৃবৃন্দ যদি তাদের প্রতিহত করে, তবে দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরও তীব্র হতে পারে। যেহেতু তারা শুধু দলের নয়, বরং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতীক হিসেবে নিজেদের পরিচিত করেছেন, তাই তাদের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দলীয় ঐক্য বজায় রেখে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, বিএনপির নেতারা যে কোন ধরনের বিভাজন ও আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে একটি সুসংহত রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করবে—এটিই বিএনপি’র ভবিষ্যত পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।