০২:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

তপন কুমার রায়ে’র গল্প : গৌরব মাঝি


গৌরব সবে এই এসে মালদার কাছে মহদীপুর বর্ডারের বি এস এফ ক্যাম্পে জয়েন করেছে। চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একবছর মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে বি এস এফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ট্রেনিং কমপ্লিট করে, তারপর এই প্রথম পোস্টিং।

এ্যাসিট্যান্ট কমান্ড্যান্ট গৌরব কে বর্ডারে ডিউটি দেন একজন পুরনো জওয়ানের সাথে । সিনিয়রের কাছ থেকে সব কিছু জেনে বুঝে নেওয়ার জন্য।একটু বেলা হতেই তার একে ফরটি সেভেন রাইফেলটা নিয়ে বর্ডারে চলে যায়।বর্ডার রোডের ধারে একটা চারফুট বাই চারফুট জায়গা ঘিরে চারটে বাঁশের ওপর খড়ের ছাউনি হল বিএসএফ পোস্ট, তাতে একটা বাঁশের বেঞ্চ করাআছে বসার জন্য।সঙ্গে বিজেন সিং পোড়খাওয়া লোক। রাস্তার ওপারেই কাঁটা তারের বেড়া। বর্ডার রোড বরাবর পাঁচশো মিটার অন্তর অন্তর এরকম একটা করে বিএসএফ পোস্ট আছে। এই বেড়ার ওপারেও নাকি পাঁচশো মিটার ভারতের জমি এখানে।তার ও ওপারে বাংলাদেশ। কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে গেট আছে সেই গেট দিয়ে ভারতের চাষীরা তাদের জমি চাষ করতে যায়,আমবাগান দেখাশোনা করতে যায়।

সকাল হতেই একে একে জনা কুড়ি লোক কাঁধে বড় বড় পলিথিলীন বস্তায় কি যেন সব নিয়ে এসে দাঁড়ালো। সবাই জড়ো হতেই সিংজী গেটের চাবি খুলে দিলেন। ওরা ঢুকে যেতেই সিংজী ওপারের বিডিআর জওয়ানকে হাত নেড়ে দিলেন।ওপার থেকে বিডিআর ও হাত নেড়ে ইশারা করলো। গৌরব আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলো না

— ইয়ে লোগ সব ক্যা খেতি করনে যা রহে হ্যায় সিংজী?
—- নেহি রে। দেখনে মে কিষান লাগতা হ্যায় ক্যা?

ইয়ে লোগ সব ছোটামোটা স্মাগলার হ্যায়। সব সল্ট,সুগার লেকে যাতা হ্যায় উসপার। বিকাকে কুছ পয়সা কামালেতে হ্যায়। বিডিআর ঔর হাম লোগ কো ভি কুছ কুছ পরসাদ মিলতে হ্যায়।
গৌরব সব শুনে চুপ করে যায়।মন থেকে মানতে পারে না।কিন্তু উপায় কি!

বিকেলে একটা লোক এসে বিজেন সিং এর সাথে কথা বলে গেলো–‘পঞ্চাশ জন’। গৌরব বোঝে কিছু একটা অন্যায় কাজ হতে যাচ্ছে। তাই চুপ করে গিয়ে বাঁশের মাচায় বসে। এই যদি ধরণ হয়, তাহলে সে কিসের বর্ডার সিকিউরিটি আর কেনই বা তার হাতে দেশরক্ষার জন্য একে ফরটি সেভেন দেওয়া?

তাকে চুপ দেখে সিংজী তার পাশে এসে বসলো। জিজ্ঞেস করলো— ক্যা হো গিয়া রে তেরেকো? দিল ছোটা মত কর।শুন, তু মেরা লেড়কা সে ভি ছোটা হ্যায়। তেরেকো কুছ আজীব সি লাগেগা ইধরে কে কাম। মেরেকো ভি পহেলে লাগতা থা। আভি সব ঠিক হো গিয়া। তেরেকো ভি ঠিক হো জায়েগা। হামলোগ নোকরি করনে আয়া, জিধার যো চলতা হ্যায়, ওয়ো তো মাননা পড়েগা। নেহিতো নোকরি ছোড়নে হোগা।মানলে বেটা, মানলে।

চাকরি ছাড়ার কথা বলতেই বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে গৌরবের। বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের গরীব আদিবাসী ঘরের ছেলে সে। বাবা হিতেন মাঝি পরের জমিতে কিষেন খাটে। সারা বছর কাজও থাকে না। তাদের পাঁচ ভাই বোনেরও ঠিক মতো খাওয়াই জুটতো না। পয়সার অভাবে বাবা তাদের ঘরের খড়ের চালটা পর্যন্ত ছাইতে পারতো না ঠিক সময়ে। বৃষ্টির দিনে হুড়হুড করে মেঝেতে লাল লাল জল পড়তো চাল থেকে। তারা ভাই বোনরা একবার এদিকটায় তো একবার ওদিকটায় ছুটতো। মিডডে মিল খাওয়ার লোভে স্কুল যেতে আরম্ভ করে সে, তারপর উচ্চমাধ্যমিক টা পাশ করেছিল। কি করবে ভেবে না পেয়ে, একদিন বাড়ী থেকে পালিয়ে সব সার্টিফিকেট নিয়ে কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের পাশে বি এস এফের ফিজিক্যাল টেস্ট দিতে হাজির হয়েছিল গৌরব। সে সিলেক্টেড হয়েছিল অনেক কষ্টে, হয়ত এস টি সার্টিফিকেটের সুবিধাও কিছু পেয়েছিল। ট্রেনিং এর সময়ই কি কম হেনস্থা সহ্য করতে হয়েছে? তবে চাকরির প্রথমমাস থেকেই সে বাবাকে টাকা পাঠায় মানি অর্ডার করে।তাইতে সংসার চলে এখন। সেই চাকরি ছাড়তে হবে? বলে কি বিজেন সিং!

সন্ধ্যের আগে লোকটা এলো।ওর নাম মধু ঘোষ। ও বিনা পাশপোর্ট- ভিসায় লোক পারাপার করে।ওই রকম পারাপার করা লোকদের বলে ‘ধূর ‘। গেট খুলে দিতেই মধু ঘোষ সুট করে ওপারে চলে গেলো। তারপরই বাংলাদেশ থেকে জনা পঞ্চাশ গরীব- গুবরো ধূর নিয়ে হাজির। সিংজী লোক গুনে পয়সা নিলেন। গৌরব কে বললেন— –“হর বার ধূর গিনকে পয়সা লেনা। ইয়ে মধু ঝুট বোলতা হ্যায়। বহুত “। রিলিভার আসতেই ওরা চলে এলো ক্যাম্পে।

বিজেন সিং বলে— বেটা, এ স্রিফ তেরা মেরা পয়সা নেহি হ্যায়। ইসসে জাদা পারসিন্ট কম্যাডান্ট কো দেনা পড়েগা। কম্যান্ডান্ট ভি আইজি সে লেকে মিনিস্টর তক পয়সা পৌঁছা দেগা। বাকিকে পয়সে তেরা ঔর মেরা হ্যায়। গৌরব সিংজীকে জানায় সে এ পয়সা নেবে না।

সিংজী গৌরবের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে — ঠিক হ্যায় বেটে,তেরে কো লেনা নেহি তো ম্যায় তেরা পয়সা হিসাব করকে রাখ দেতে হ্যায়। আগর কভি মর্জি হোগা তো বোলনা।তেরা এক পয়সা ভি ইধার ওধার নেহি হোগা।

গৌরব কিছু উত্তর করে না। সন্ধ্যের পর দেখে একদল বিএসএফ শতখানেকেরও বেশী বড় বড় হরিয়ানার বলদ নিয়ে ক্যাম্পে হাজির।এগুলো বাংলাদেশের ঈদে নাকি কুরবানির জন্য পাচার হচ্ছে। মুহূর্তে ই দুজন দালাল এসে হজির হয়ে গেলো। এ্যাসিট্যান্ট কমান্ডড্যান্ট এসে দালালদের পঁচাশিটা গরু অনেক হাজার টাকা করে বেচে দিল।তারপর বাইশটা গরুর কিছু বাছুর, কিছু অসুস্থ দেখিয়ে পেপার রেডি করে মালদা কাস্টমস অফিসে পাঠালো।কাস্টমসের লোক দেখতেও এলো না। গরু পিছু কিছু টাকা নিয়ে পেপারে অকশন করে দিল তারা।সে অকশনেও ওই দালাল দুটোই গরু কিনে নিলো। তারপর বিএসএফ গরু পিছু কিছু টাকা নিয়ে রিলিজ দিল। গরু তো তারআগে কবেই বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে।
এসব কান্ড দেখে গৌরব মাথার ঠিক রাখতে পারে না। সে গৌরব মাঝি, সিধু কানু বীরসার রক্ত তার গায়ে। এই হিন্দু মুসলমানদের ধর্ম তার নয়।তার হলো “সারি” ধর্ম, সত্য ধর্ম । এ ধর্ম নিয়ে কোন অন্যায়ের কাছে সে মাথা নত করবে না। দেশ রক্ষার প্রতিজ্ঞা নিয়ে সে চাকরিতে ঢুকেছে।প্রতিজ্ঞা যদি না থাকে তো কিসের চাকরি? দরকারে মা ভাই বোন নিয়ে সে জঙ্গলে চলে যাবে। জঙ্গল তাদের মা। ঠিক বাঁচিয়ে রাখবে।

পরের দিন সে আবার সিংজীর সাথে এসে তাদের বর্ডার পোস্টের নীচে বসেছে। একটু পরেই আশপাশের গ্রাম থেকে দলে দলে মোটা মোটা মহিলা এসে তাদর ছাউনির নীচে জমা হতে থাকে।কেউ কেউ এধার ওধার বসেও পড়ে। গৌরব বুঝতে পারে না এই সব ঘরোয়া বৌ-ঝি রা কি করতে এসেছে! গৌরব সিংজীকে জিজ্ঞেস করে—” কি ব্যাপার”? সিংজী বলে এই সব ঘরোয়া মহিলারা পেটের জ্বালায় স্মাগলারের কাছ থেকে ফেন্সিডিলের বোতল নিয়ে বডিতে সেট করে বাংলা দেশে ক্যারি করে নিয়ে যায়। বিনিময়ে যা পায় তা থেকেও দু পয়সা বিএসএফ কে দিয়ে যায়।

গৌরব জিজ্ঞেস করে –“এদের আটকাও না কেন সিংজী”।

সিংজী বলেন— –” রুখনে সে ইনলোগোকো খানা নেহি মিলেগা। ভুখা মরনা পড়েগা ফ্যামিলি লেকে। পেট লিয়েহি এ কাম করতি হ্যায় এলোগ”।
— তো ফির ইনসে পয়সা কিঁউ লেতে হ্যায়?
— এক তো আদত পড়গিয়া।দুসরা মজবুরি। ওপরওয়ালা পয়সা মাঙ্গেগা। তো ফির—-! বিএসএফ কা ইন্টেলেজেন্স ভি হ্যায়,ওয়ো সব বতা দেগা।

ঠিক তখনই ভট্ভট্ আওয়াজ তুলে এ্যাসিস্ট্যান্ট কমাড্যান্টের বাইক এসে থামল। সিংজী ও গৌরব স্যালুট করলো। এ সি বললো– “পাখি ঔর রত্না কো বুলা।”

বিজেন সিং দুই মহিলাকে নিয়ে হাজির করলো। মুখ দেখেই বোঝা যায় একটু কম বয়েসর মেয়ে এরা। এ সি মেয়ে দুটি কে বললো,— “ওয়াপসি মে মেরা কোয়ার্টার মে আনা”। বলেই বাইক নিয়ে ফিরে গেল।

গৌরব সিংজীকে জিজ্ঞেস করলো—” কিঁউ বুলাতা হ্যায়? পয়সা তো আপ দে হি দেঙ্গে।”— —“লড়কি বালা কাম তে মুঝসে নেহি হো পায়েগা না বেটা। চুপ যা, বাতে মত কর।দেখতে যা স্রিফ”। রাগে গৌরবের মাথায় আগুন ধরে যায় যেন। না, এ চাকরি বোধহয় গৌরব করতে পারবে না। সিংজী বলেন—-“ওয়াক্ত কে সাথ শোচ বিচার ভি বদল জায়েগা। আপনা কাম, আপনা বিচার সে হি কর। যো নেহি করনা হ্যায়, মত কর।”

ক্যাম্পে মোটামুটি সবাই জেনে গেছে গৌরব মাঝি অন্য রকমের ছেলে। তাই ওকে কেউ অড কাজ করতেও বলে না,খানিক এড়িয়ে ই চলে।শুধু বিজেন সিং ওকে খুব ভালোবাসে, তাই সাহেব কে বলে নিজের সাথেই ডিউটিতে রেখেছে।

এগারো সাল তখন।একদিন বিকেলে বর্ডার রোড দিয়ে বিজেন সিং আর গৌরব ডিউটি শেষে ফিরছিল।হঠাৎ তারকাঁটার ওপারের ঝোপঝাড় ভেদ করে একঝাঁক গুলি ছুটে আসে। একটা গুলি এসে সিংজির হাতে লাগে। গৌরব কম্যান্ডো কায়দায় সিংজী কে নিয়ে শুয়ে পড়ে।তারপর তাকিয়ে দেখে ওপারের দুটো বিডিআর গুলি চালাচ্ছে।শুয়ে শুয়েই একহাতে তার একে ফরটি সেভেন চালায় গৌরব। অব্যর্থ নিশানা,দুটো গুলিতেই দুটো বডি ঝুপ ঝুপ করে পড়ে গেলো। সিংজীর ওয়াকিটকি থেকে হেড অফিসকে সব জানালো। কিন্তু হেড অফিস জীপ পাঠাতে পারবে না,কারন বর্ডার জড়ে উত্তেজনা রয়েছে। কেন, কিছু বুঝতে পারে না, অগত্যা গৌরব সিংজীকে জড়িয়ে ধরে একহাতে রাইফেল উঁচিয়ে কোনক্রমে ক্যাম্পে এলো। সিংজীর ক্ষত গভীর নয়। টেডভ্যাক দিয়ে, সিম্পল ড্রেস করে দিল।

গৌরব ক্যাম্পে এসে শুনলো বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। ইন্ডিয়া থেকে ফোর্স যাতে না যায়,তাই বিডিআর কন্টিনিউয়াস গুলি চালাচ্ছে। বিএসএফ গুলি করছে না, কারন তাদর কোন অর্ডার নেই। এক তো তারা মিনিস্ট্রি অফ হোমের আান্ডারে। ডিফেন্স মিনিস্ট্রি, আর মিনিস্ট্রি অফ ফরেন এ্যাফেয়ারস কিছু বলে নি। মেল পাঠিয়ে,হট লাইনে কথা বলেও কিছু অর্ডার পাওয়া যায় নি।তার ওপর বাংলাদেশ বন্ধুরাষ্ট্র তাই অর্ডার ছাড়া কিছু করা যাবে না। বিএসএফ শুধু বর্ডার থেকে কাস্টমস, ইমিগ্রেশনের লোকদের সরাচ্ছে। আহত গ্রামবাসীদের শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।ওদিকে বিডিআর কিন্তু সাহসী হয়ে উঠছে। গুলি চালাতে চালাতে কাস্টমস গেটের দিকে এগিয়ে আসছে। গৌরব তার একে ফরটি সেভেন নিয়ে কম্যান্ড্যান্টের কাছে ছুটলো — “স্যার হামকো অর্ডার দিজিয়ে। নেহি তো ও লোগ হাম লোগোকো মার দেগা”। কম্যান্ড্যান্ট বলে– “মেরা পাশ কোই অর্ডার নেহি হ্যায়,তেরেকো ক্যা অর্ডার দেগা, তু হিয়াসে ভাগকে কঁহিভি যা স্যাকতে আভি।”
— স্যার, ম্যায় ট্রাইব মে সাঁওতাল হুঁ।ভাগনে নেহি জানতা।খাড়ি খাড়ি মর যায়ুঙ্গা, ফির ভাগুঙ্গা নেহি।

তারপর সে সাহেবের কাছে একটা লাইট মেশিন গান আর কিছু গুলি ভর্তি ম্যাগাজিন চায়।সাহেব জিজ্ঞেস করে সে কি একলাই লড়তে চায়? এতে এক তো সে মরতে পারে, দ্বিতীয়ত পরে কোন এনকোয়ারী এলে তার চাকরি যেতে পারে। গৌরব জানায় দেশ রক্ষার ওথ নিয়েছে সে, না সে চাকরি কে ভয় করে, না মরতে ভয় করে। কম্যান্ড্যার আর্মারী থেকে দরকার মতো বন্দুক নিয়ে নিতে বলে। আসলে রাজপুত কম্যান্ড্যান্ট ও লড়তে চাইছিলেন।কিন্তু তার তো হাত পা বাঁধা।

গৌরব তার বন্দুক গুলো নিয়ে গেটের পাশের প্রাচীন গৌড়রাজ্যের মাটির উঁচু পাঁচিলের ওপর উঠে একটা ঢিবির পিছনে পজিশন নেয়। তারপর তার রাইফেল থেকে মুহুর্মুহু গুলি বেরতে থাকে।জাতে সাঁওতাল, জন্ম থেকে প্রায় তীর ধনুক ধরেছে।অব্যর্থ লক্ষ্য। এক একগুলিতে এক একটা বডি ফেলে দেয়। একটা ম্যাগাজিন শেষ হলে আর একটা ম্যাগাজিন লাগিয়ে নেয়। ও পক্ষের প্রচুর হতাহতের পর বিডিআর এর ফরোয়ার্ড মার্চ বন্ধ হয়। গৌরব রাইফেলটা গরম হয়ে যাচ্ছে দেখে স্ট্যান্ডের ওপর লাগানে এল এম জি টা চালায় ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা করে। ওপারে একটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে বুঝতে পারে। এদিকে অন্ধকার নেমে আসছে দূরে সঠিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
কম্যান্ড্যান্ট গৌরবের কাজে উদ্বিগ্ন ছিলই। কিন্তু সেই সময়েই রিটেলিয়েশনের অর্ডারটা এলো হোম মিনিস্ট্রি থেকে।এবার তিনি সবটা সামলে নিতে পারবেন।তিনি সকলকে এ্যাটাকের অর্ডার দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ওপারের বন্দুক সব চুপ করে গেছে। তার এক জওয়ানই একশো জওয়ানের লড়াই লড়ে দিয়েছে।

সব চুপ হয়ে গেছে দেখেও গৌরব তার পজিশন থেকে নড়লো না। কিন্তু গাছ পালার আর অন্ধকারের আড়ালে কখন যে মৃত্যুদূত নিঃশব্দে উঠে আসছিল সে বুঝতে পারেনি।জনা ছয়েক বিডিআর জওয়ান অনেকটা দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রাচীরে উঠে এগিয়ে আসছিলো।কিন্তু একটা মাটির গর্তমতো জায়গায় গৌরব শুয়ে থাকার জন্য ওরাও গুলি করার ঠিক পজিশন পাচ্ছিল না। হঠাৎ এস এল আর থেকে এক ঝাঁক গুলি তার দিকে ছুটে আসতে গৌরবের খেয়াল হল শত্রু কাছে এসে গেছে। তখন আর উপায় নেই দেখে গৌরব গর্ত ছেড়ে উঠে মেশিনগান ঘুরিয়ে সোজা গুলি চালাতে থাকলো। ততক্ষণে তার পেটে আর পায়ে দুটো গুলি লেগেছে। তবে ওই ছজন শত্রুই শেষ।

প্রাচীরের ওপর ফায়ারিং দেখে বিএসএফ এর জওয়ানরা বন্দুক উঁচিয়ে ছুটে উঠে এলো। ততক্ষণে শত্রুদের গৌরব শেষ করে দিয়েছে বটে কিন্তু নিজেও গুলি খেয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।জ্ঞানহীন। কম্যান্ড্যান্ট কে ওয়াকিটকিতে জানাতেই, তিনি এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গৌরব কে তুলে নিয়ে মালদা ডিস্ট্রিক্ট হসপিটালের ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে হাজির হলেন।


 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

তপন কুমার রায়ে’র গল্প : গৌরব মাঝি

প্রকাশিত : ১১:২৪:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ এপ্রিল ২০২৪

গৌরব সবে এই এসে মালদার কাছে মহদীপুর বর্ডারের বি এস এফ ক্যাম্পে জয়েন করেছে। চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একবছর মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে বি এস এফ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ট্রেনিং কমপ্লিট করে, তারপর এই প্রথম পোস্টিং।

এ্যাসিট্যান্ট কমান্ড্যান্ট গৌরব কে বর্ডারে ডিউটি দেন একজন পুরনো জওয়ানের সাথে । সিনিয়রের কাছ থেকে সব কিছু জেনে বুঝে নেওয়ার জন্য।একটু বেলা হতেই তার একে ফরটি সেভেন রাইফেলটা নিয়ে বর্ডারে চলে যায়।বর্ডার রোডের ধারে একটা চারফুট বাই চারফুট জায়গা ঘিরে চারটে বাঁশের ওপর খড়ের ছাউনি হল বিএসএফ পোস্ট, তাতে একটা বাঁশের বেঞ্চ করাআছে বসার জন্য।সঙ্গে বিজেন সিং পোড়খাওয়া লোক। রাস্তার ওপারেই কাঁটা তারের বেড়া। বর্ডার রোড বরাবর পাঁচশো মিটার অন্তর অন্তর এরকম একটা করে বিএসএফ পোস্ট আছে। এই বেড়ার ওপারেও নাকি পাঁচশো মিটার ভারতের জমি এখানে।তার ও ওপারে বাংলাদেশ। কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে গেট আছে সেই গেট দিয়ে ভারতের চাষীরা তাদের জমি চাষ করতে যায়,আমবাগান দেখাশোনা করতে যায়।

সকাল হতেই একে একে জনা কুড়ি লোক কাঁধে বড় বড় পলিথিলীন বস্তায় কি যেন সব নিয়ে এসে দাঁড়ালো। সবাই জড়ো হতেই সিংজী গেটের চাবি খুলে দিলেন। ওরা ঢুকে যেতেই সিংজী ওপারের বিডিআর জওয়ানকে হাত নেড়ে দিলেন।ওপার থেকে বিডিআর ও হাত নেড়ে ইশারা করলো। গৌরব আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলো না

— ইয়ে লোগ সব ক্যা খেতি করনে যা রহে হ্যায় সিংজী?
—- নেহি রে। দেখনে মে কিষান লাগতা হ্যায় ক্যা?

ইয়ে লোগ সব ছোটামোটা স্মাগলার হ্যায়। সব সল্ট,সুগার লেকে যাতা হ্যায় উসপার। বিকাকে কুছ পয়সা কামালেতে হ্যায়। বিডিআর ঔর হাম লোগ কো ভি কুছ কুছ পরসাদ মিলতে হ্যায়।
গৌরব সব শুনে চুপ করে যায়।মন থেকে মানতে পারে না।কিন্তু উপায় কি!

বিকেলে একটা লোক এসে বিজেন সিং এর সাথে কথা বলে গেলো–‘পঞ্চাশ জন’। গৌরব বোঝে কিছু একটা অন্যায় কাজ হতে যাচ্ছে। তাই চুপ করে গিয়ে বাঁশের মাচায় বসে। এই যদি ধরণ হয়, তাহলে সে কিসের বর্ডার সিকিউরিটি আর কেনই বা তার হাতে দেশরক্ষার জন্য একে ফরটি সেভেন দেওয়া?

তাকে চুপ দেখে সিংজী তার পাশে এসে বসলো। জিজ্ঞেস করলো— ক্যা হো গিয়া রে তেরেকো? দিল ছোটা মত কর।শুন, তু মেরা লেড়কা সে ভি ছোটা হ্যায়। তেরেকো কুছ আজীব সি লাগেগা ইধরে কে কাম। মেরেকো ভি পহেলে লাগতা থা। আভি সব ঠিক হো গিয়া। তেরেকো ভি ঠিক হো জায়েগা। হামলোগ নোকরি করনে আয়া, জিধার যো চলতা হ্যায়, ওয়ো তো মাননা পড়েগা। নেহিতো নোকরি ছোড়নে হোগা।মানলে বেটা, মানলে।

চাকরি ছাড়ার কথা বলতেই বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে গৌরবের। বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের গরীব আদিবাসী ঘরের ছেলে সে। বাবা হিতেন মাঝি পরের জমিতে কিষেন খাটে। সারা বছর কাজও থাকে না। তাদের পাঁচ ভাই বোনেরও ঠিক মতো খাওয়াই জুটতো না। পয়সার অভাবে বাবা তাদের ঘরের খড়ের চালটা পর্যন্ত ছাইতে পারতো না ঠিক সময়ে। বৃষ্টির দিনে হুড়হুড করে মেঝেতে লাল লাল জল পড়তো চাল থেকে। তারা ভাই বোনরা একবার এদিকটায় তো একবার ওদিকটায় ছুটতো। মিডডে মিল খাওয়ার লোভে স্কুল যেতে আরম্ভ করে সে, তারপর উচ্চমাধ্যমিক টা পাশ করেছিল। কি করবে ভেবে না পেয়ে, একদিন বাড়ী থেকে পালিয়ে সব সার্টিফিকেট নিয়ে কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের পাশে বি এস এফের ফিজিক্যাল টেস্ট দিতে হাজির হয়েছিল গৌরব। সে সিলেক্টেড হয়েছিল অনেক কষ্টে, হয়ত এস টি সার্টিফিকেটের সুবিধাও কিছু পেয়েছিল। ট্রেনিং এর সময়ই কি কম হেনস্থা সহ্য করতে হয়েছে? তবে চাকরির প্রথমমাস থেকেই সে বাবাকে টাকা পাঠায় মানি অর্ডার করে।তাইতে সংসার চলে এখন। সেই চাকরি ছাড়তে হবে? বলে কি বিজেন সিং!

সন্ধ্যের আগে লোকটা এলো।ওর নাম মধু ঘোষ। ও বিনা পাশপোর্ট- ভিসায় লোক পারাপার করে।ওই রকম পারাপার করা লোকদের বলে ‘ধূর ‘। গেট খুলে দিতেই মধু ঘোষ সুট করে ওপারে চলে গেলো। তারপরই বাংলাদেশ থেকে জনা পঞ্চাশ গরীব- গুবরো ধূর নিয়ে হাজির। সিংজী লোক গুনে পয়সা নিলেন। গৌরব কে বললেন— –“হর বার ধূর গিনকে পয়সা লেনা। ইয়ে মধু ঝুট বোলতা হ্যায়। বহুত “। রিলিভার আসতেই ওরা চলে এলো ক্যাম্পে।

বিজেন সিং বলে— বেটা, এ স্রিফ তেরা মেরা পয়সা নেহি হ্যায়। ইসসে জাদা পারসিন্ট কম্যাডান্ট কো দেনা পড়েগা। কম্যান্ডান্ট ভি আইজি সে লেকে মিনিস্টর তক পয়সা পৌঁছা দেগা। বাকিকে পয়সে তেরা ঔর মেরা হ্যায়। গৌরব সিংজীকে জানায় সে এ পয়সা নেবে না।

সিংজী গৌরবের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে — ঠিক হ্যায় বেটে,তেরে কো লেনা নেহি তো ম্যায় তেরা পয়সা হিসাব করকে রাখ দেতে হ্যায়। আগর কভি মর্জি হোগা তো বোলনা।তেরা এক পয়সা ভি ইধার ওধার নেহি হোগা।

গৌরব কিছু উত্তর করে না। সন্ধ্যের পর দেখে একদল বিএসএফ শতখানেকেরও বেশী বড় বড় হরিয়ানার বলদ নিয়ে ক্যাম্পে হাজির।এগুলো বাংলাদেশের ঈদে নাকি কুরবানির জন্য পাচার হচ্ছে। মুহূর্তে ই দুজন দালাল এসে হজির হয়ে গেলো। এ্যাসিট্যান্ট কমান্ডড্যান্ট এসে দালালদের পঁচাশিটা গরু অনেক হাজার টাকা করে বেচে দিল।তারপর বাইশটা গরুর কিছু বাছুর, কিছু অসুস্থ দেখিয়ে পেপার রেডি করে মালদা কাস্টমস অফিসে পাঠালো।কাস্টমসের লোক দেখতেও এলো না। গরু পিছু কিছু টাকা নিয়ে পেপারে অকশন করে দিল তারা।সে অকশনেও ওই দালাল দুটোই গরু কিনে নিলো। তারপর বিএসএফ গরু পিছু কিছু টাকা নিয়ে রিলিজ দিল। গরু তো তারআগে কবেই বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে।
এসব কান্ড দেখে গৌরব মাথার ঠিক রাখতে পারে না। সে গৌরব মাঝি, সিধু কানু বীরসার রক্ত তার গায়ে। এই হিন্দু মুসলমানদের ধর্ম তার নয়।তার হলো “সারি” ধর্ম, সত্য ধর্ম । এ ধর্ম নিয়ে কোন অন্যায়ের কাছে সে মাথা নত করবে না। দেশ রক্ষার প্রতিজ্ঞা নিয়ে সে চাকরিতে ঢুকেছে।প্রতিজ্ঞা যদি না থাকে তো কিসের চাকরি? দরকারে মা ভাই বোন নিয়ে সে জঙ্গলে চলে যাবে। জঙ্গল তাদের মা। ঠিক বাঁচিয়ে রাখবে।

পরের দিন সে আবার সিংজীর সাথে এসে তাদের বর্ডার পোস্টের নীচে বসেছে। একটু পরেই আশপাশের গ্রাম থেকে দলে দলে মোটা মোটা মহিলা এসে তাদর ছাউনির নীচে জমা হতে থাকে।কেউ কেউ এধার ওধার বসেও পড়ে। গৌরব বুঝতে পারে না এই সব ঘরোয়া বৌ-ঝি রা কি করতে এসেছে! গৌরব সিংজীকে জিজ্ঞেস করে—” কি ব্যাপার”? সিংজী বলে এই সব ঘরোয়া মহিলারা পেটের জ্বালায় স্মাগলারের কাছ থেকে ফেন্সিডিলের বোতল নিয়ে বডিতে সেট করে বাংলা দেশে ক্যারি করে নিয়ে যায়। বিনিময়ে যা পায় তা থেকেও দু পয়সা বিএসএফ কে দিয়ে যায়।

গৌরব জিজ্ঞেস করে –“এদের আটকাও না কেন সিংজী”।

সিংজী বলেন— –” রুখনে সে ইনলোগোকো খানা নেহি মিলেগা। ভুখা মরনা পড়েগা ফ্যামিলি লেকে। পেট লিয়েহি এ কাম করতি হ্যায় এলোগ”।
— তো ফির ইনসে পয়সা কিঁউ লেতে হ্যায়?
— এক তো আদত পড়গিয়া।দুসরা মজবুরি। ওপরওয়ালা পয়সা মাঙ্গেগা। তো ফির—-! বিএসএফ কা ইন্টেলেজেন্স ভি হ্যায়,ওয়ো সব বতা দেগা।

ঠিক তখনই ভট্ভট্ আওয়াজ তুলে এ্যাসিস্ট্যান্ট কমাড্যান্টের বাইক এসে থামল। সিংজী ও গৌরব স্যালুট করলো। এ সি বললো– “পাখি ঔর রত্না কো বুলা।”

বিজেন সিং দুই মহিলাকে নিয়ে হাজির করলো। মুখ দেখেই বোঝা যায় একটু কম বয়েসর মেয়ে এরা। এ সি মেয়ে দুটি কে বললো,— “ওয়াপসি মে মেরা কোয়ার্টার মে আনা”। বলেই বাইক নিয়ে ফিরে গেল।

গৌরব সিংজীকে জিজ্ঞেস করলো—” কিঁউ বুলাতা হ্যায়? পয়সা তো আপ দে হি দেঙ্গে।”— —“লড়কি বালা কাম তে মুঝসে নেহি হো পায়েগা না বেটা। চুপ যা, বাতে মত কর।দেখতে যা স্রিফ”। রাগে গৌরবের মাথায় আগুন ধরে যায় যেন। না, এ চাকরি বোধহয় গৌরব করতে পারবে না। সিংজী বলেন—-“ওয়াক্ত কে সাথ শোচ বিচার ভি বদল জায়েগা। আপনা কাম, আপনা বিচার সে হি কর। যো নেহি করনা হ্যায়, মত কর।”

ক্যাম্পে মোটামুটি সবাই জেনে গেছে গৌরব মাঝি অন্য রকমের ছেলে। তাই ওকে কেউ অড কাজ করতেও বলে না,খানিক এড়িয়ে ই চলে।শুধু বিজেন সিং ওকে খুব ভালোবাসে, তাই সাহেব কে বলে নিজের সাথেই ডিউটিতে রেখেছে।

এগারো সাল তখন।একদিন বিকেলে বর্ডার রোড দিয়ে বিজেন সিং আর গৌরব ডিউটি শেষে ফিরছিল।হঠাৎ তারকাঁটার ওপারের ঝোপঝাড় ভেদ করে একঝাঁক গুলি ছুটে আসে। একটা গুলি এসে সিংজির হাতে লাগে। গৌরব কম্যান্ডো কায়দায় সিংজী কে নিয়ে শুয়ে পড়ে।তারপর তাকিয়ে দেখে ওপারের দুটো বিডিআর গুলি চালাচ্ছে।শুয়ে শুয়েই একহাতে তার একে ফরটি সেভেন চালায় গৌরব। অব্যর্থ নিশানা,দুটো গুলিতেই দুটো বডি ঝুপ ঝুপ করে পড়ে গেলো। সিংজীর ওয়াকিটকি থেকে হেড অফিসকে সব জানালো। কিন্তু হেড অফিস জীপ পাঠাতে পারবে না,কারন বর্ডার জড়ে উত্তেজনা রয়েছে। কেন, কিছু বুঝতে পারে না, অগত্যা গৌরব সিংজীকে জড়িয়ে ধরে একহাতে রাইফেল উঁচিয়ে কোনক্রমে ক্যাম্পে এলো। সিংজীর ক্ষত গভীর নয়। টেডভ্যাক দিয়ে, সিম্পল ড্রেস করে দিল।

গৌরব ক্যাম্পে এসে শুনলো বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। ইন্ডিয়া থেকে ফোর্স যাতে না যায়,তাই বিডিআর কন্টিনিউয়াস গুলি চালাচ্ছে। বিএসএফ গুলি করছে না, কারন তাদর কোন অর্ডার নেই। এক তো তারা মিনিস্ট্রি অফ হোমের আান্ডারে। ডিফেন্স মিনিস্ট্রি, আর মিনিস্ট্রি অফ ফরেন এ্যাফেয়ারস কিছু বলে নি। মেল পাঠিয়ে,হট লাইনে কথা বলেও কিছু অর্ডার পাওয়া যায় নি।তার ওপর বাংলাদেশ বন্ধুরাষ্ট্র তাই অর্ডার ছাড়া কিছু করা যাবে না। বিএসএফ শুধু বর্ডার থেকে কাস্টমস, ইমিগ্রেশনের লোকদের সরাচ্ছে। আহত গ্রামবাসীদের শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।ওদিকে বিডিআর কিন্তু সাহসী হয়ে উঠছে। গুলি চালাতে চালাতে কাস্টমস গেটের দিকে এগিয়ে আসছে। গৌরব তার একে ফরটি সেভেন নিয়ে কম্যান্ড্যান্টের কাছে ছুটলো — “স্যার হামকো অর্ডার দিজিয়ে। নেহি তো ও লোগ হাম লোগোকো মার দেগা”। কম্যান্ড্যান্ট বলে– “মেরা পাশ কোই অর্ডার নেহি হ্যায়,তেরেকো ক্যা অর্ডার দেগা, তু হিয়াসে ভাগকে কঁহিভি যা স্যাকতে আভি।”
— স্যার, ম্যায় ট্রাইব মে সাঁওতাল হুঁ।ভাগনে নেহি জানতা।খাড়ি খাড়ি মর যায়ুঙ্গা, ফির ভাগুঙ্গা নেহি।

তারপর সে সাহেবের কাছে একটা লাইট মেশিন গান আর কিছু গুলি ভর্তি ম্যাগাজিন চায়।সাহেব জিজ্ঞেস করে সে কি একলাই লড়তে চায়? এতে এক তো সে মরতে পারে, দ্বিতীয়ত পরে কোন এনকোয়ারী এলে তার চাকরি যেতে পারে। গৌরব জানায় দেশ রক্ষার ওথ নিয়েছে সে, না সে চাকরি কে ভয় করে, না মরতে ভয় করে। কম্যান্ড্যার আর্মারী থেকে দরকার মতো বন্দুক নিয়ে নিতে বলে। আসলে রাজপুত কম্যান্ড্যান্ট ও লড়তে চাইছিলেন।কিন্তু তার তো হাত পা বাঁধা।

গৌরব তার বন্দুক গুলো নিয়ে গেটের পাশের প্রাচীন গৌড়রাজ্যের মাটির উঁচু পাঁচিলের ওপর উঠে একটা ঢিবির পিছনে পজিশন নেয়। তারপর তার রাইফেল থেকে মুহুর্মুহু গুলি বেরতে থাকে।জাতে সাঁওতাল, জন্ম থেকে প্রায় তীর ধনুক ধরেছে।অব্যর্থ লক্ষ্য। এক একগুলিতে এক একটা বডি ফেলে দেয়। একটা ম্যাগাজিন শেষ হলে আর একটা ম্যাগাজিন লাগিয়ে নেয়। ও পক্ষের প্রচুর হতাহতের পর বিডিআর এর ফরোয়ার্ড মার্চ বন্ধ হয়। গৌরব রাইফেলটা গরম হয়ে যাচ্ছে দেখে স্ট্যান্ডের ওপর লাগানে এল এম জি টা চালায় ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা করে। ওপারে একটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে বুঝতে পারে। এদিকে অন্ধকার নেমে আসছে দূরে সঠিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
কম্যান্ড্যান্ট গৌরবের কাজে উদ্বিগ্ন ছিলই। কিন্তু সেই সময়েই রিটেলিয়েশনের অর্ডারটা এলো হোম মিনিস্ট্রি থেকে।এবার তিনি সবটা সামলে নিতে পারবেন।তিনি সকলকে এ্যাটাকের অর্ডার দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ওপারের বন্দুক সব চুপ করে গেছে। তার এক জওয়ানই একশো জওয়ানের লড়াই লড়ে দিয়েছে।

সব চুপ হয়ে গেছে দেখেও গৌরব তার পজিশন থেকে নড়লো না। কিন্তু গাছ পালার আর অন্ধকারের আড়ালে কখন যে মৃত্যুদূত নিঃশব্দে উঠে আসছিল সে বুঝতে পারেনি।জনা ছয়েক বিডিআর জওয়ান অনেকটা দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রাচীরে উঠে এগিয়ে আসছিলো।কিন্তু একটা মাটির গর্তমতো জায়গায় গৌরব শুয়ে থাকার জন্য ওরাও গুলি করার ঠিক পজিশন পাচ্ছিল না। হঠাৎ এস এল আর থেকে এক ঝাঁক গুলি তার দিকে ছুটে আসতে গৌরবের খেয়াল হল শত্রু কাছে এসে গেছে। তখন আর উপায় নেই দেখে গৌরব গর্ত ছেড়ে উঠে মেশিনগান ঘুরিয়ে সোজা গুলি চালাতে থাকলো। ততক্ষণে তার পেটে আর পায়ে দুটো গুলি লেগেছে। তবে ওই ছজন শত্রুই শেষ।

প্রাচীরের ওপর ফায়ারিং দেখে বিএসএফ এর জওয়ানরা বন্দুক উঁচিয়ে ছুটে উঠে এলো। ততক্ষণে শত্রুদের গৌরব শেষ করে দিয়েছে বটে কিন্তু নিজেও গুলি খেয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।জ্ঞানহীন। কম্যান্ড্যান্ট কে ওয়াকিটকিতে জানাতেই, তিনি এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গৌরব কে তুলে নিয়ে মালদা ডিস্ট্রিক্ট হসপিটালের ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে হাজির হলেন।