বাংলাদেশে এখন বিচার হয় না আদালতে-হয় রাস্তায়। সামান্য সন্দেহেই মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। গত ছয় দিনে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ছয়জন। আর মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত মাত্র ১০ মাসে ১৪৩ জন মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়-এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও আইনের শাসনের চরম পতনের প্রতিচ্ছবি। পরিসংখ্যান যা আতঙ্কিত করে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ১০ মাসে ১৪৩ জন নিহত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ৭ মাসেই ১১৪টি ঘটনায় ১১৯ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত
শুধু ২০২৫ সালের জুন মাসেই ৪১টি গণপিটুনির ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়-এগুলো একটি সমাজের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভয়, প্রতিশোধ ও বিচারহীনতা রাজত্ব করছে।
বিচার নেই, তাই সহিংসতা। এই সহিংসতার মূল কারণ একটাই: বিচারহীনতা। অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা ধরা পড়ে না, আর ধরা পড়লেও শাস্তি হয় না। ২০১৯ সালে ঢাকার বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেনুকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড হলেও, বেশিরভাগ আসামি খালাস পেয়েছেন বা এখনো বিচারাধীন। HRSS জানায়, গণপিটুনির ঘটনা সাধারণত চুরি, মাদক বা ছেলেধরা সন্দেহে ঘটে। তবে এখন রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও ব্যক্তিগত শত্রুতাও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।
গুজব, ভয় ও জনতার উন্মাদনা, মসজিদের মাইক, ফেসবুক পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ গুজব-এই সবই এখন মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কুমিল্লার মুরাদনগরে এক মা ও তার দুই সন্তানকে মাদক বিক্রির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়-কোনো বিচার, প্রমাণ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই। শএটি বিচার নয়-এটি বর্বরতা।
ইউনূস সরকার: আশার প্রতীক না ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি?
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব নেওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিলেন, দেশে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের নতুন যুগ শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সময়েই গণপিটুনির ঘটনা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। সরকার বারবার “আইনের শাসন” প্রতিষ্ঠার কথা বললেও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে-পুলিশ নিষ্ক্রিয়, তদন্ত দুর্বল, আর রাজনৈতিক সদিচ্ছা অনুপস্থিত।
বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এই পরিস্থিতিকে “রক্তাক্ত শাসন” বলে আখ্যা দিয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও, এই সমালোচনার পেছনে রয়েছে জনমানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা-রাষ্ট্র যেন আর উপস্থিত নেই।
করণীয় কী?
এই সহিংসতা বন্ধ করতে হলে বাংলাদেশকে এখনই সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে: প্রতিটি গণপিটুনির ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরাধীদের প্রকাশ্যে বিচার করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা পুলিশ ও প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুজব প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও সহায়তা গ্রহণ করে মানবাধিকার মানদণ্ড বজায় রাখা। পরিতাপের বিষয় গণপিটুনি কোনো বিচার নয়-এটি একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন। যদি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সে নিজেই এই মৃত্যুর দায়ে অংশীদার হয়ে পড়ে।
“যেখানে রাষ্ট্র নীরব, সেখানে জনতা হয়ে ওঠে বিচারক, জুরি ও জল্লাদ-এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা।” বাংলাদেশকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-আইনের শাসন, না জনতার রোষ? সময় খুব বেশি নেই।
শফিকুল ইসলাম কাজল, মানবাধিকারকর্মী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক 













