নিয়মের অধিন ষড় ঋতুর এই বাংলাদেশে প্রতি দু’মাস অন্তর আবহাওয়া ও প্রকৃতি নিজের রঙ পাল্টায়। কিন্তু এই দেশেরই রাজনীতিতে বিতর্কের রঙ ঝেড়ে ফেলে চিরাচরিত চরিত্রের নিয়ম পাল্টাতে পারছে না জামায়াতে ইসলামী।
অধিকারের পক্ষে, আগ্রাসন আর ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলনে হাজারো শহীদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই গত ৩১ আগস্ট ভারতের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক চায় বলে স্পষ্ট ঘোষণা দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান। এই জামায়াত যেন দ্বিতীয়বার স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া ঋতু বদলের এই বাংলাদেশে ভাদ্র মাসের আকাশ। আবু সাঈদ, মুগ্ধ কিংবা শহীদ জিহাদদের রক্ত যেন সেই আকাশেই এখন অসময়ে রক্তের বৃষ্টি হয়ে ঝড়েছে।
রাজনৈতিক ভুলে ভরা জামায়াত ভুল ট্রেনে উঠেছে বহুবার। তাই এবার নোঙর বিহীন জাহাজে চড়েই যেতে চায় বহুদূর; এ যেন দিক হারানো পালতোলা নৌকা। তাইতো গত ০৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সব ধরণের নির্যাতনের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা জামায়াতের। আওয়ামী সঙ্গদোষে অভ্যস্ত জামায়াতের আওয়ামী প্রীতি যেন কমছেই না। জনমনে খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন, ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করার জামায়াত কে? কে এই অধিকার দিল জামায়াতকে?
যে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে জাতির সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া না চাওয়ার দ্বন্দে ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন দলটির সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। শুধু আব্দুর রাজ্জাকই নয় পদত্যাগ করে বিতর্কের মঞ্চে থাকা এই দলের এক ঝাঁক নেতাকর্মী। ১৯৭১ থেকে ২০২৪, দেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন যেখানে, সেখানেই জামায়াতের বিতর্ক। যেন থামছে না। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সমগ্র জুলাই থেকে আগস্ট, ঝরেছে কত তাজা প্রাণ; দ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠা রক্ত ঝরেছে রাজপথে। আন্দোলন ছাপিয়েছে ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানে। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে নাকি স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। এতসব বিতর্কিত বক্তব্যের পরে হালে পানি না পাওয়ায় এবার জামায়াত আমিরের বক্তব্য, “আমাদের ভুল হলে সংশোধন করে দিবেন। আমাদের ভুলের কারণে জাতি ক্ষতিগ্রস্থ হোক এটা আমরা চাই না।”
সমসাময়িক প্রজন্মের রূপান্তরকে পাশ কাটাতে চায় জামায়াত। ধর্ম, অনুভূতি আর রাজনীতি; গণমাধ্যম আর জনতার মঞ্চে জামায়াত এখন সিনেমার নায়িকাদের মতোই। উপচে পড়া জনতার ভিড়, গণমাধ্যম কাভারেজেই খেই হারিয়েছে দলটি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি এক সমাবেশে যুক্ত হয়ে তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “প্রতিবেশী দেশের ফাঁদে পা দিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্ত হয়ে কিছু কথা বলছে। এজন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে। দেশের ভেতরে-বাইরে যারা কলকাঠি নাড়ছে তারা চাই না দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসুক।”
বিগত সময়ে কত যাত্রাপালাই হয়েছে মঞ্চস্থ। নায়িকা মাহিয়া মাহিও ছুটেছেন ট্রাক নিয়ে; ট্রাকের গতি আর রুপের আগুণে চুপসে গেছে নির্বাচন। হারিয়েছে জামানত। এই অসময়ের যাত্রা পালায় অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা দলগুলো হয়ত এই বাস্তবতা উপলন্ধি করবে। রাজনৈতিক মঞ্চ আর যাত্রাপালার মঞ্চ কখনোই যে এক না। জনগণ নির্বাচনের মঞ্চে রাজনৈতিক শ্রেণীকেই চায়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির কাঁধে চড়েই নিজেদের নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৮ টি আসন পেয়েছিলো জামায়াতে ইসলামী। এরপর এই খেলায় আর ঘুরে দাঁড়াতেই পারেনি দলটি। অনেক দলেরই হয়ত অন্ধ বিশ্বাস, শস্যের চেয়ে নাকি টুপি বেশি। তাই হয়ত একই দুর্ভোগ জুটেছে জামাতের রাজনীতিতেও। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নবম সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২টি আসন পায় দলটি।
মরা গাঙে যেমন জোয়ার আসে না জামাতেরও সেই একই দশা। সমসাময়িক প্রজন্মের রূপান্তরের এই রাজনীতিতে তারেক রহমান কতটা প্রাসঙ্গিক সেই কথা অকপটেই স্বীকার করে নেয় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেদের এক সেমিনারে। মন্তব্য করেন, “আমরা যা শুনতে চাই তাই বলেন তারেক জিয়া সাহেব।” এই একই অনুভূতি ছড়িয়েছে আজ গ্রাম বাংলার ৮৭ হাজার গ্রামে, মিশে থাকা ধানের শীষে। স্বপ্ন-সম্ভাবনা-বাস্তবতা আর সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ে একটি নাম, দেশপ্রেমিক তারেক রহমান।
গাজী সাইফুল 














