ড. মো. এরশাদ হালিম
অবাধ মেলামেশা ও যত্রতত্র সহজলভ্য রোমান্টিকতা বা রোমান্টিসিজম যুব সমাজকে ঘুণ পোকার মত তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। দিনে দিনে ধবংস হচ্ছে সুস্থ পরিবার কাঠামো। মূলত পরিবার হচ্ছে একটা রাষ্ট্রের মনোমারিক কিংবা ডিস্ট্রাকচারাল ইউনিট। তাই মনোমার না থাকলে যেমন পলিমার গঠন সম্ভব নয়, তেমনি পরিবার প্রথা উঠে গেলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বও হয় হুমকির সম্মুখীন। সেক্ষেত্রে, গ্রহণযোগ্য সকল প্রগতি ও আধুনিকতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে হলেও সুস্থ স্বাভাবিক পরিবার ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেয়া অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি প্রগতি ও আধুনিকতা শব্দ দুটি ব্যবহারের আগে আমাদের ভাবতে হবে আসলে কোনটি প্রগতি আর কোনটি পশ্চাতগতি। তা না হলে তথাকথিত প্রগতি ও আধুনিকতা ডেকে আনতে পারে মহাবিপর্যয়, এমনকি সেটা হতে পারে পৃথিবী ধবংসের পুর্ব আলামত।
মানব সভ্যতা না থাকলে পৃথিবীর অস্তিত্ব আশা করা যায়না। তাই কোন একটা সভ্য জাতিকে ধবংস করার জন্য আধুনিকতার নামে এমন অশ্লীলতা বা বেহায়াপনাই যথেষ্ট। এ ব্যাপারে এখন থেকেই উদ্যোগী না হলে সামনে এক অন্ধকার ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকেই উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং তৈরী করতে হবে গণসচেতনতা। মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া এক সময়কার ধর্মীয় মুল্যবোধগুলো পুনরায় জাগ্রত করতে হবে। পারিবারিকভাবে আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার উপর বেশী বেশী গুরুত্বারোপ করতে হবে। বিভিন্ন সময় জনবান্ধব সরকারগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগীতা ও দিক নির্দেশনা চেয়ে নিতে হবে এবং সরকারীভাবেও অব্যাহত রাখতে হবে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার উপর আরোপ করতে হবে বাধ্যবাধকতা। তরুন প্রজন্মের জন্যে সরকারী ও বেসরকারী সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতায় মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ণে বিভিন্ন কাউন্সেলিং, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদির আয়োজন করতে হবে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী যারা বিবর্তনের ফলে বানর থেকে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষে রূপান্তরের ধারণা দেয় এবং যাদের শেষ টার্গেট হয়তবা সম্প্রদায় বিশেষের আরাধ্য বস্তু হনুমান, আমার মনে হয় না এ নিয়ে তাদের কোন কনসার্ন বা মাথা ব্যাথা আদোই আছে।
উল্লেখ্য যে, অনেক সময় ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা দেখলে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসগুলো অনেকটা বাংলা সিনেমার শুটিং স্পটের মত। বিশেষ করে কোনো কোন বিভাগের বারান্দায় প্রেম-ভালোবাসার নামে রীতিমত ছায়াছন্দের কল্পনায় অন্তরংগ মুহুর্তের রোমান্টিক দৃশ্যগুলো নিঃসঙ্কোচে চিত্রায়িত হয় আর কর্তৃপক্ষ অবলীলায় দর্শনীয় দৃশ্যগুলো উপভোগ করছে। মনে ভেসে ওঠে সেই ১৯৭৯ সালের আজিজুর রহমান পরিচালিত এবং রাজ্জাক-শাবানা অভিনীত “অভিমান” ছায়াছবির বিখ্যাত গানের লাইন “দেহের সাথে মিলবে দেহ, মনের সাথে মন, তা না হলে প্রেম কী হয় অমূল্য রতন” অথবা “বাহুডোরে না জড়ালে, প্রেমের কী মজা মেলে”। আজব এক দেশ, যা দেশের বাইরে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজ ক্যাম্পাসে কখনো চোখে পড়েনি। এমনকি কখনও কখনও শিক্ষা সফরগুলোকে মনে হয় কারো কারো নিকট বহুল কাংক্ষিত মধুচন্দ্রিমা। কোথাও কোথাও নবীণ বরণ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পর্বের নামে আয়োজিত হয় যেন যাত্রাপালা “রসের বাইদানী”।
পাশাপাশি বহিরাগত অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসন দেশীয় সুস্থ বিনোদনকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ধবংস করে যুব সমাজকে দিনে দিনে বিপদগামী করছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের লিভ টোগেদার ফর্মুলা তরুন সমাজকে খুব বেশী প্রভাবিত করছে। একটা বয়স থাকে যখন মন অনেক কিছুই চায়। আর এই ডিজিটালাইজড যুগে অনেক চাওয়া পাওয়াই সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার কারনে কখনো কখনো মেঘ না চাইতেই চলে আসে বৃষ্টি। বিশেষ করে পর্ণোগ্রাফি তরুন প্রজন্মের কাছে বিনোদনের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা দখল করে নিয়েছে। নেশা দ্রব্যসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিভিন্ন বিকৃত যৌনাচারও যুব সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপনের দিকে। বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমান দিনে দিনে জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলছে। পরকীয়া সম্পর্কের বৈধতার বিষয়টি অতি শীঘ্রই পরিনত হবে সময়ের দাবীতে। শেষ পর্যন্ত পরিবার ব্যবস্থা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবেবে না। অনেক পরিবারেই বাবা-মা দু’জনই কর্মব্যস্ততার কারনে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারায় অনেকটা সাক্ষী গোপালের মতই সব কিছু দেখছে এবং অভিভাবক হিসেবে তাদেরকে অসহায়ত্ব বরন করে নিতে হচ্ছে। এটাই এখনকার বাস্তবতা। যেন এক কালো মেঘের অমানিশা হাতছানি দিচ্ছে পুরো জাতিকে উদ্দেশ্য করে। তাই আর দেরী নয়। এখনই পদক্ষেপ নেয়ার উপযুক্ত সময়। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে এর চড়া মাশুল গুনতে হবে।
পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের সকল কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে তাঁর নিকট পরিপূর্নভাবে আত্মসমর্পন করে তাঁর করুণা ও দয়ার দ্বারস্থ হতে হবে। হেদায়েতের মালিক মহান আল্লাহ কিন্তু সর্বাত্মক প্রচেষ্টা আমাদের হাতে। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে সরল সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।
অধ্যাপক, গবেষক ও সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা
রসায়ন বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নিজস্ব প্রতিবেদক 













