০৯:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
রাজনৈতিক জামায়াত ধর্মকে পুঁজি করে দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারায় দেশের মানুষের ভাগ্য বন্টনের সুযোগ চায়

ধর্মের বানরের পিঠা ভাগের দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশের মানুষ দেশের সংস্কারের দায়িত্ব তুলে দিতে কি আদৌ প্রস্তুত?

  • গাজী সাইফুল
  • প্রকাশিত : ১০:১৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৫
  • 122

রাজনৈতিক জামায়াত ধর্মকে পুঁজি করে যে দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারায় দেশের মানুষের ভাগ্য বন্টনের সুযোগ চায়; ধর্মের বানরের পিঠা ভাগের এ দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশের মানুষ দেশের সংস্কারের দায়িত্ব তুলে দিতে কি আদৌ প্রস্তুত?

ইসলামকে পুঁজি করে ২০০৮ এর নির্বাচনে ২ সিট পাওয়া রাজনৈতিক জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি বিএনপি’র কাঁধে ভর করে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জয় পেয়েছিলো জামায়াতে ইসলামী।

জনম্যান্ডেটহীন জামায়াতের অবস্থা অনেকটা এমন ‘শষ্যের চেয়ে টুপি বেশি। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য জাতির সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া না চাওয়ার প্রশ্নে এবং জামায়াত বিলুপ্তের পরামর্শ দিয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আগেই এই ক্ষমা প্রার্থনা করা দরকার ছিল। সেই ক্ষমাপ্রার্থনা ছাড়াই ১৯৭১ সালে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া জামায়াতে ইসলামীসহ চারটি দল জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) চার দশক ধরে রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলো।

এক. পদত্যাগের পেছনে আব্দুর রাজ্জাক দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এতে বলা হয়, জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে ও অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে দলটি নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।

দুই. গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য সম্প্রতি দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভা হয়। দলের তরুণ নেতৃত্বের দাবির মুখে সভায় একাত্তরের ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং জামায়াত নামক দল বিলুপ্ত করে সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে দলকে নিয়োজিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা মজলিশে শুরায় অনুমোদন পায়নি।

জামায়াতের বিষয়ে প্রশ্ন হলো ৭১ এর বিষয়ে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ই নয়। সংস্কারের বিষয়টা তাদের আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তন।”
“জামায়াত নেতারা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিলে সেটি কোন সংস্কার। তাহলে মওদুদীর যে পথ তা থেকে সরে আসতে হবে তাদের। সেটি করবেন কি-না – এসব আলোচনা আগেই হওয়া উচিত ছিলো বলেও মনে করেন জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শকে ভ্রান্তি মতামত দিয়ে সরে আসা দলটির নেতারা। বহু ইসলামপন্থী দল এটি করেছে কিন্তু জামায়াত সেটি আগে করেনি”। শুধুমাত্র সাংগঠনিক সংস্কারে জামায়াত গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে মনে করেন না অনেক বিশ্লেষকরাও।

এমন বিষয়গুলো ছাড়াও জামায়াতের ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিতে মওদূদীবাদের যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দলীয় নেতাকর্মীদের শপথের পূর্ব মুহূর্তের সময়গুলোতে দেওয়া হয়, সেখানে জঙ্গিবাদের নির্যাস থেকেই যায়। সর্বশেষ ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ (এসএইচবি) নামে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নতুন একটি জঙ্গি সংগঠন খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছিলো র্যাব। একটি সূত্রের দাবী, সে ঘটনায় চট্টগ্রাম ইসলামী ছাত্র শিবিরের দক্ষিণ ও উত্তর শাখার ১৭ নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পায় ইসলামী ছাত্রশিবির। যদিও তখন র্যাবের দাবি করে সংগঠনের ২৫ জন সদস্য রয়েছে। এদের মধ্যে ২৪ জনই আটক হয়েছেন। র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছিলেন গণমাধ্যমকে।

ধর্মের নামে রাজনৈতিক অপতৎপরতার কারণে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। এ দেশকে জঙ্গিবাদের কালো তালিকাভুক্ত করতে সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত জামায়াতে ইসলামী। তাই জঙ্গি নির্মূল করতে হলে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ/ রাজনীতির সংস্কার করার পাশাপাশি ধর্মীয় রাজনীতির নামে অপতৎপরতা রোধ করতে হবে।

ধর্মীয় জঙ্গিবাদের আদর্শ ধারণ করে জামায়াতের রাজনীতি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কি ধরণের সংস্করণ আনবে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না অবশ্যই।

জামায়াতে ইসলামী দলটির সংস্কার অবধারিত হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে সংস্কারের ব্যাপারে যেসব কথাবার্তা হচ্ছে তার লক্ষ্য সাংগঠনিক সংস্কার, না আদর্শিক সংস্কার?

জামায়াতের ইতিহাস যাঁরা জানেন তাঁরা সহজেই স্মরণ করতে পারবেন যে এখন যে দুই প্রশ্ন এসেছে তা একেবারে নতুন কিছু নয়। দলগতভাবে জামায়াতে ইসলামী নামে প্রকাশ্যে দল করা না–করার ব্যাপারে ১৯৭৯ সালে যখন আলোচনার সূত্রপাত হয়, তখনই ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং এই নামে সংগঠন না করার বিষয় এসেছিল। ১৯৭৬ সালে জামায়াত নেতারা নেজামে ইসলামীর সঙ্গে একত্রে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) করেন, কেননা ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক দল বিধির (পিপিআর) আওতায় আবেদন করেও তাঁরা অনুমোদন পাননি। কিন্তু ১৯৭৮ সালে জামায়াত নেতা গোলাম আযম বাংলাদেশে আসার পরে তিন বছর আগে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ১৯৭৯ সালে জামায়াতের উত্থান ঘটানো হয়েছিল।

১৯৮২ সালে মাওলানা আবদুল জাব্বার এবং ছাত্রশিবির নেতা আহমদ আবদুল কাদের বাচ্চুর নেতৃত্বে দলের একাংশের আলাদা করে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করার পেছনে জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়ও ছিল। তার পরে ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত জামায়াত নেতারা সংস্কার নিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রস্তাব পাঠান। ২০১০ সালের মাঝামাঝি দলের একাংশ কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা পদত্যাগ করেন। কারাগার থেকে ২০১০ সালের নভেম্বরে কামারুজ্জামানের লেখা চিঠি এবং তার পরে দলের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে এখন সবাই জ্ঞাত।

২০০১ সালের আগে পর্যন্ত সংস্কারের আলোচনায় সংস্কার করে জামায়াতকে কীভাবে দাঁড় করানো হবে, তা নিয়ে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। কিন্তু তারপর থেকে আলোচনায় প্রত্যক্ষভাবেই তুরস্কের একে পার্টি, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের কথা উল্লিখিত হয়, পরে ২০১২ সালে থেকে এর সঙ্গে তিউনিসিয়ায় এন্নেহাদা দলের কথাও বলা হচ্ছে। পদত্যাগী জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক ২০১২ সালে তাঁর লেখায় এবং প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব উদাহরণ টেনেছেন।

উল্লেখ্য, গত ৫ই আগস্টের পর নতুন বোতলে পুরনো মদ ঢেলে দেওয়ার মতোই জামায়াতকে রাজনীতির মাঠে নতুনত্ব/ভিন্ন এজেন্ডায় সরব উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। সম্প্রতি গত ০৩ জানুয়ারি ‘জামায়াতে ইসলামীকে পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক শক্তি বলে আখ্যায়িত  করার প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। তিনি বলেন, ‘১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে এবং মানবতাবিরোধী অবস্থান করেও স্বাধীন দেশে জামায়াতে ইসলামকে দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা ইতিহাসের নির্মম রসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।’

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে নিজ দেশের নাগরিকদের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকা দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে কি? এসব বক্তব্য মুক্তিকামী মানুষের জন্য অসম্মানজনকও বটে। তবে রাজনৈতিক জামায়াত ধর্মকে পুঁজি করে যে দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারায় দেশের মানুষের ভাগ্য বন্টনের সুযোগ চায়; ধর্মের বানরের পিঠা ভাগের এ দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশের মানুষ দেশের সংস্কারের দায়িত্ব তুলে দিতে আদৌ কি মানুষিকভাবে প্রস্তুত?

জনপ্রিয়

জাতীয় পুনর্গঠন কৌশল (National Reconstruction Strategies)

রাজনৈতিক জামায়াত ধর্মকে পুঁজি করে দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারায় দেশের মানুষের ভাগ্য বন্টনের সুযোগ চায়

ধর্মের বানরের পিঠা ভাগের দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশের মানুষ দেশের সংস্কারের দায়িত্ব তুলে দিতে কি আদৌ প্রস্তুত?

প্রকাশিত : ১০:১৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৫

রাজনৈতিক জামায়াত ধর্মকে পুঁজি করে যে দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারায় দেশের মানুষের ভাগ্য বন্টনের সুযোগ চায়; ধর্মের বানরের পিঠা ভাগের এ দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশের মানুষ দেশের সংস্কারের দায়িত্ব তুলে দিতে কি আদৌ প্রস্তুত?

ইসলামকে পুঁজি করে ২০০৮ এর নির্বাচনে ২ সিট পাওয়া রাজনৈতিক জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি বিএনপি’র কাঁধে ভর করে নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জয় পেয়েছিলো জামায়াতে ইসলামী।

জনম্যান্ডেটহীন জামায়াতের অবস্থা অনেকটা এমন ‘শষ্যের চেয়ে টুপি বেশি। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য জাতির সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া না চাওয়ার প্রশ্নে এবং জামায়াত বিলুপ্তের পরামর্শ দিয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আগেই এই ক্ষমা প্রার্থনা করা দরকার ছিল। সেই ক্ষমাপ্রার্থনা ছাড়াই ১৯৭১ সালে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া জামায়াতে ইসলামীসহ চারটি দল জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) চার দশক ধরে রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলো।

এক. পদত্যাগের পেছনে আব্দুর রাজ্জাক দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এতে বলা হয়, জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে ও অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে দলটি নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।

দুই. গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার জন্য সম্প্রতি দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভা হয়। দলের তরুণ নেতৃত্বের দাবির মুখে সভায় একাত্তরের ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং জামায়াত নামক দল বিলুপ্ত করে সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে দলকে নিয়োজিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা মজলিশে শুরায় অনুমোদন পায়নি।

জামায়াতের বিষয়ে প্রশ্ন হলো ৭১ এর বিষয়ে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ই নয়। সংস্কারের বিষয়টা তাদের আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তন।”
“জামায়াত নেতারা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিলে সেটি কোন সংস্কার। তাহলে মওদুদীর যে পথ তা থেকে সরে আসতে হবে তাদের। সেটি করবেন কি-না – এসব আলোচনা আগেই হওয়া উচিত ছিলো বলেও মনে করেন জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শকে ভ্রান্তি মতামত দিয়ে সরে আসা দলটির নেতারা। বহু ইসলামপন্থী দল এটি করেছে কিন্তু জামায়াত সেটি আগে করেনি”। শুধুমাত্র সাংগঠনিক সংস্কারে জামায়াত গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে মনে করেন না অনেক বিশ্লেষকরাও।

এমন বিষয়গুলো ছাড়াও জামায়াতের ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিতে মওদূদীবাদের যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দলীয় নেতাকর্মীদের শপথের পূর্ব মুহূর্তের সময়গুলোতে দেওয়া হয়, সেখানে জঙ্গিবাদের নির্যাস থেকেই যায়। সর্বশেষ ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ (এসএইচবি) নামে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নতুন একটি জঙ্গি সংগঠন খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছিলো র্যাব। একটি সূত্রের দাবী, সে ঘটনায় চট্টগ্রাম ইসলামী ছাত্র শিবিরের দক্ষিণ ও উত্তর শাখার ১৭ নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পায় ইসলামী ছাত্রশিবির। যদিও তখন র্যাবের দাবি করে সংগঠনের ২৫ জন সদস্য রয়েছে। এদের মধ্যে ২৪ জনই আটক হয়েছেন। র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছিলেন গণমাধ্যমকে।

ধর্মের নামে রাজনৈতিক অপতৎপরতার কারণে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। এ দেশকে জঙ্গিবাদের কালো তালিকাভুক্ত করতে সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত জামায়াতে ইসলামী। তাই জঙ্গি নির্মূল করতে হলে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ/ রাজনীতির সংস্কার করার পাশাপাশি ধর্মীয় রাজনীতির নামে অপতৎপরতা রোধ করতে হবে।

ধর্মীয় জঙ্গিবাদের আদর্শ ধারণ করে জামায়াতের রাজনীতি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কি ধরণের সংস্করণ আনবে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না অবশ্যই।

জামায়াতে ইসলামী দলটির সংস্কার অবধারিত হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে সংস্কারের ব্যাপারে যেসব কথাবার্তা হচ্ছে তার লক্ষ্য সাংগঠনিক সংস্কার, না আদর্শিক সংস্কার?

জামায়াতের ইতিহাস যাঁরা জানেন তাঁরা সহজেই স্মরণ করতে পারবেন যে এখন যে দুই প্রশ্ন এসেছে তা একেবারে নতুন কিছু নয়। দলগতভাবে জামায়াতে ইসলামী নামে প্রকাশ্যে দল করা না–করার ব্যাপারে ১৯৭৯ সালে যখন আলোচনার সূত্রপাত হয়, তখনই ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং এই নামে সংগঠন না করার বিষয় এসেছিল। ১৯৭৬ সালে জামায়াত নেতারা নেজামে ইসলামীর সঙ্গে একত্রে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) করেন, কেননা ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক দল বিধির (পিপিআর) আওতায় আবেদন করেও তাঁরা অনুমোদন পাননি। কিন্তু ১৯৭৮ সালে জামায়াত নেতা গোলাম আযম বাংলাদেশে আসার পরে তিন বছর আগে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ১৯৭৯ সালে জামায়াতের উত্থান ঘটানো হয়েছিল।

১৯৮২ সালে মাওলানা আবদুল জাব্বার এবং ছাত্রশিবির নেতা আহমদ আবদুল কাদের বাচ্চুর নেতৃত্বে দলের একাংশের আলাদা করে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করার পেছনে জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়ও ছিল। তার পরে ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত জামায়াত নেতারা সংস্কার নিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রস্তাব পাঠান। ২০১০ সালের মাঝামাঝি দলের একাংশ কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা পদত্যাগ করেন। কারাগার থেকে ২০১০ সালের নভেম্বরে কামারুজ্জামানের লেখা চিঠি এবং তার পরে দলের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে এখন সবাই জ্ঞাত।

২০০১ সালের আগে পর্যন্ত সংস্কারের আলোচনায় সংস্কার করে জামায়াতকে কীভাবে দাঁড় করানো হবে, তা নিয়ে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। কিন্তু তারপর থেকে আলোচনায় প্রত্যক্ষভাবেই তুরস্কের একে পার্টি, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের কথা উল্লিখিত হয়, পরে ২০১২ সালে থেকে এর সঙ্গে তিউনিসিয়ায় এন্নেহাদা দলের কথাও বলা হচ্ছে। পদত্যাগী জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক ২০১২ সালে তাঁর লেখায় এবং প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব উদাহরণ টেনেছেন।

উল্লেখ্য, গত ৫ই আগস্টের পর নতুন বোতলে পুরনো মদ ঢেলে দেওয়ার মতোই জামায়াতকে রাজনীতির মাঠে নতুনত্ব/ভিন্ন এজেন্ডায় সরব উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। সম্প্রতি গত ০৩ জানুয়ারি ‘জামায়াতে ইসলামীকে পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক শক্তি বলে আখ্যায়িত  করার প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। তিনি বলেন, ‘১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে এবং মানবতাবিরোধী অবস্থান করেও স্বাধীন দেশে জামায়াতে ইসলামকে দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা ইতিহাসের নির্মম রসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।’

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে নিজ দেশের নাগরিকদের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকা দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে কি? এসব বক্তব্য মুক্তিকামী মানুষের জন্য অসম্মানজনকও বটে। তবে রাজনৈতিক জামায়াত ধর্মকে পুঁজি করে যে দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারায় দেশের মানুষের ভাগ্য বন্টনের সুযোগ চায়; ধর্মের বানরের পিঠা ভাগের এ দাঁড়িপাল্লায় বাংলাদেশের মানুষ দেশের সংস্কারের দায়িত্ব তুলে দিতে আদৌ কি মানুষিকভাবে প্রস্তুত?