খড়ের চাল ওঠা মাটির ঘরটার সামনের দাওয়ায় মাদুর বিছিয়ে মশারি খাটিয়ে শুয়েছিল নিশিকান্ত তার আর সব ভাইবোনেদের সাথে। বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যমাস টায় তারা ঘরের ভেতর শুতে পারে না গরমের জন্য। তাই ঘর ছেড়ে বাইরের দাওয়ায়ই শোয়,একটু হাওয়া পাবে বলে। মশারীটা টান করে গুঁজে দেয় মাদুরে, যাতে সাপ,বিছে, বা অন্য পোকামাকড় না ঢোকে।
দখিনা হাওয়ায় মশারীটা ফুলে ফুলে উঠছিল ঠিক নিশিকান্তর বুকের স্বপ্ন গুলোর মত। নিশিকান্ত সবে দশ বছর বয়স, গ্রামেরই স্কুলে ক্লাশ ফাইভে পড়ে। পড়াশোনায় ভালোই নিশিকান্ত। এমনি ক্লাশে প্রতিবছর ফার্স্ট হয়। ক্লাশ ফোরের বৃত্তি পরীক্ষায় সে বোর্ডেও ফার্স্ট হয়ে বৃত্তি পেয়েছে।কিন্তু গ্রামের ভাঙাচোরা অনামী স্কুলের পড়াকে কেউ পাত্তা দেয় না। তাছাড়া এত নীচু ক্লাশে ভালো রেজাল্টের কোন দাম নেই।
বাবা নিমাই সরকার গ্রামের তাদেরই প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার। তারা ছয় ভাই বোন। তাদের জমিজমা বিশেষ কিছু নেই। বাড়ীতে মাসের শেষ দিকে খাবার সঙ্কুলান দায় হয়ে যায়। ফেনভাত আর আলুভাতে রোজকার মেনু, কচ্চিৎ নোনা ইলিশের একটা ছোট্ট টুকরোই যথেষ্ট আনন্দের । গ্রামের দোকানে প্রতি মাসে টাকা বাকি পড়ে। দোকানদারও অনেক কথা শোনায়। তাই আর একটু উপায় করার জন্য বাবা নন্দীদের বাড়ীর ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়ায়।
নিশিকান্ত সন্ধ্যেবেলা বাবার সাথে গিয়ে ওদের ছেলেমেয়েদের সাথে বাবার কাছেই অংক করে। নন্দীরা ব্যবসায়ী বড়োলোক, ওদের ছেলে মেয়েদের পাশে বসতে একটু অস্বস্তি হয় বৈকি। বাবা বলে, জামাকাপড় ছেঁড়া হোক লজ্জা নেই কিন্তু কাচা পরিস্কার থাকা উচিত। নিশিকান্ত তাই পরিস্কার থাকার চেষ্টা করে। মা তো রান্নাবান্না ছাড়াও ধান সেদ্ধ করা, ভাপানো, ধান শুকনো করা এমনি অনেক কাজ। আবার সাজি মাটি দিয়ে বড় হাড়িতে রোজ এতগুলো লোকের জামাকাপড় সেদ্ধ, তারপর পুকুর ঘাটে নিয়ে গিয়ে কাচাকাচি করতে করতেই মায়ের রোজ বেলা তিনটে বেজে যায়।তাই নিশাকান্ত নিজের জামাকাপড়টা অন্তত নিজে কাচে।
বাবা বলেছে, সব সময় সব জিনিষ,সব ঘটনা, কি কেন জানতে চেষ্টা করবে।নিজেই ভেবে উত্তর বার করবে। না পারলে জিজ্ঞেস করবে।নিশিকান্ত তাই মানে। কাগজ কেটে সেলাই করে একটা নোটবুক করেছে, তাতে সব কিছু লিখে রাখে। কোন অচেনা শব্দ পেলেও অর্থসহ লিখে রাখে। একটা ছেড়া ইংরেজি ডিক্সনারী যোগাড় করে, সেটা মুখস্থ করে রোজ। বাবা বলেছে, — “ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে লোকে যে স্বপ্ন দেখে তা স্বপ্ন নয়, যে স্বপ্ন মানুষ কে ঘুমাতে দেয় না তা ই হলো স্বপ্ন”। বড়ো স্বপ্ন দেখতে হবে। নিশিকান্ত তাই এই দারিদ্র্য মুক্ত হয়ে বড়ো হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সে জানে না কি ভাবে, কোন রাস্তায় তার স্বপ্ন সফল হবে। তবে বাবা বলে,
– ঠিক সময়ে, ঠিক রাস্তায়,ঠিক কাজ করলে সে সফল হবেই।
কিন্তু কোনটা ঠিক সময়,কোনটা রাস্তা, সে জানে না। কে তাকে পথ দেখাবে তা ও জানে না।তাই নিজে যেটা বোঝে তাই করে। বাবা তখনকার দিনের ম্যাট্রিক পাশ মাত্র। দিন গুজরানের চিন্তায় সময় কাটে তার। কোন স্বপ্ন তার জানাও নেই। তবে বাবা বলে–” চলতে চলতে রাস্তা তৈরী হয়, ঠিক রাস্তার খোঁজ মেলে”। নিশিকান্ত এগুলোকে জীবনে ধ্রুব সত্য মেনে চলে।চলতে চলতেই সে রাস্তা করবে।সে একাধারে অর্জুন আর একালব্য হতে চায়। চাই গভীর অধ্যাবসায়।
গ্রামের তরুন পাঠাগারে গিয়ে,রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,তারাশঙ্কর, শরৎ চন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, মানিক, সমরেশ,সুনীল বুদ্ধদেব আদি সব পড়ে শেষ করে ফেলেছিল খুব অল্প বয়েসে। বিশ্বসাহিত্যের বাংলা অনুবাদ ও সব শেষ। রোজ খবরের কাগজ থেকে নোট নিয়ে রাখতো দেশ বিদেশের খবর।
ক্লাশ সিক্সে একটা বৃত্তি হতো। সে পরীক্ষায় ও বাংলায় ফাস্ট হয়ে ছিল। এগুলো কিছু নয় তবে পরে ভালো স্কুলে পড়ার জন্য টিউশন ফি লাগতো না। দাদার পড়াশোনার বায়নাক্কা প্রচুর ছিল।তার জন্য পয়সা যোগাতে বাড়ীতে মাঝে মাঝে চিন্তার ছায়া নেমে আসতো। তখন বাড়ীর কাঁসার থালা বাসন বিক্রি করে পয়সা যোগার করতো বাবা। নিশিকান্তর চোয়াল শক্ত হতো। কিন্তু কিছু করার মত তাড়াতাড়ি বড়ও তো সে হতে পারছে না। তার বুকে যে চুপসানো বেলুনের মত অনেক স্বপ্ন। কবে যে সেগুলো হাওয়া ভরে আকাশে উঠবে!
সিনিয়র ছেলেমেয়েরা ক্লাশে উঠলে সে তাদের পুরনো বই পত্তর চেয়ে আনতো। সেগুলো সব সে আগে ভাগে পড়ে রাখতো। স্বপ্ন রাতে তাকেও ঘুমাতে দিত না। লন্ঠনের আলোয় সে রান্না ঘরের দাওয়ায় বসে অনেক রাত পর্যন্ত পড়তো। দাদা দিদি সবাই তাকে ঠাট্টা করতো। কিন্তু সে তো পড়া ছাড়া কিছু জানতো না, যা দিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করা যায়। বাবা বলেছে চলতে চলতে রাস্তা তৈরী হয়, অন্য রাস্তার খোঁজ পাওয়া যায়। গ্রামের সূর্য দের ভাই অনন্ত ইন্জিনিয়ার,গ্রামে থাকে না। কখনও এলে নিশিকান্ত দেখা করতে যেত।অনন্ত তাকে অনেক বড় বড় শহরে গিয়ে কোচিং নেওয়া, পড়ার অনেক খরচ এইসব বলতো। এড়িয়ে যেত তাক । কিন্তু নিশিকান্ত ছিল স্বপ্ন পাগল। যে যা ভাবে কি যায় আসে তার।তাকে হামাগুড়ি দিয়ে কি, মাটি কামড়েও পৌঁছাতে হবে। নোখের ভিতর কাদা ঢুকে রক্ত বেরোবে, কিন্তু একটুও নিরাশ হলে চলবে না,হাল ছাড়া যাবে না। ফস্কে গেলে অতল গহ্বরে গিয়ে পড়া, তাই যতক্ষণ বেঁচে আছে লড়াই করতে হবে।
সে সময়টা উনিশ শো ঊনসত্তর -সত্তর সাল। শহর থেকে সব ইয়ং ছেলেরা প্রান ভয়ে গ্রামে পালিয়ে আসছিলো।তাদের গ্রামেও এরকম কয়েকজন এসেছিল। এরা বেশীর ভাগ বাহিরে বেরোতো না।
অনিমেষ মুখার্জি নামে একটি ছেলে তাদের পাশের বাড়ী এসেছিলো। সেই অনিমেষদার সাথে পরিচয় করেছিল নিশিকান্ত। রোজ যেত পড়া নিয়ে আলোচনা করত।তার স্বপ্নের কথা বলতো। অনিমেষদা কোলকাতার প্রসিডেন্সি কলেজ থেকে পাশ করেছে। এবছর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেওয়ার কথা। কিন্তু কোলকাতার খুনোখুনি আরম্ভ হওয়ায় ও চলে এসেছে। পরের বছর দেবে। নিশিকান্ত স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। দেশবন্ধু, নেতাজী সবাই সিভিল সার্ভিস পাশ করেছিল। সে ও নিশ্চয় পারবে। বাবা বলেছে লক্ষ্য স্থির করে সঠিক পথে এগোতে হবে। নিশিকান্তও পরীক্ষার খুটিনাটি জানতে চেষ্টা করে অনিমেষদার কাছ থেকে। ও অনিমেষ দার আনা বই গুলো ঘাটাঘাটি শুরু করে। নিজের মনে আরো আরো কঠিন প্রশ্ন তৈরি করে, তারপর নিজেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে।অনিমেষদা বলেছিল এ পরীক্ষার জন্য স্পেশাল কোচিং দরকার হয়।আগেকার দিনে লন্ডন গিয়ে পরীক্ষা দিত।এখন দিল্লি গিয়ে প্রিপারেশন নিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। নিশকান্ত তো কোনদিন কোলকাতাই যায়নি,তার আবার দিল্লি। তাহলে স্বপ্ন সফল করতেও পয়সা খরচ করতে হয়? নিশিকান্ত নিজেকে একালব্য ভাবে। তাকে করতেই হবে। একট ছোট্ট সন্তোষ রেডিও কিনে সবসময় বিবিসি নিউজ শোনা আরম্ভ করলো। ইংরাজির সাথে নিজেকে সড়গড় করে তোলার জন্য।
কলেজে ঢুকে সে মন-প্রাণ পড়াশোনায় ঢেলে দিল। কলেজে বিশাল লাইব্ররী, কত বই। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে নিশিকান্ত।সব রকম পড়া করতে শুরু করলো। সীতাংশু স্যারের বয়স কম। তার কাছেই গেলো নিশিকান্ত,খুলে বললো তার স্বপ্নের কথা। সীতাংশু স্যার নিজেও সিভিল সার্ভিসের কথা ভেবে ছিলেন জীবনে, হয় নি। কলেজের চাকরীটা তাকে মেনে নিতে হয়েছিল। তাঁর সেই অতৃপ্ত বাসনা, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, তিনি নিশিকান্তের মধ্যে দিয়ে পূরণ করতে চাইলেন।প্রথমেই নিশিকান্তকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে এসে রাখলেন। তারপর গুরু শিষ্যের মিলিত লড়াই।
কপালে বোধহয় আর স্বপ্ন পূরণ হলো না। বাড়ী থেকে বন্ধুরা খবর নিয়ে এলো, নিশিকান্তর বাবা হঠাৎ করে হার্ট এট্যাকে মারা গেলেন। নিজেকে স্থির রাখতে পারল না নিশিকান্ত। স্যারকে একবার বলেই সে বাড়ী চলে গেলো। সে ফিরে আসতে চেয়েছিল, সীতাংশু স্যারই বললেন বাড়ীতে থেকে যতটা সম্ভব পড়, তারপর কাজ মিটলে ফিরে এসো। গ্রামের নিয়ম অনুযায়ী কাছা নিয়েছিল।খাওয়ারও অনেক নিয়ম কানুন, সবসময় লোকজনের আসা যাওয়া। একটুও বই খোলার সময় নেই। গরীব মানুষের বাড়ী, একটাই ঘর। কোন ফুরসৎ ই নেই বই খোলার। খুলতে গেলেও আত্মীয়দের বাঁকা কথা। হতাশ লাগে নিশিকান্তর। স্বপ্ন দেখাই সার।
বাবার স্কুলের কমিটি নিশিকান্তকে কমপ্যাসিওনেট গ্রাউন্ডে চাকরির দেবে ঠিক করল। কিন্তু তার চোখে যে অনেক বড় স্বপ্ন। নিশিকান্ত তাই চাকরিটা নেবেনা জানিয়ে দিল। দাদা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে,তাই বাবার চাকরিটা তার দাদা শ্রীকান্ত নিল।
সীতাংশু স্যার নিজের পয়সা খরচ করে দিল্লীর বিভিন্ন কোচিং সেন্টার থেকে তাদের স্টাডি মেটেরিয়াল আনাতে শুরু করলেন। গত দশ বছরের সিভিল সার্ভিসের প্রশ্নপত্র আনালেন। সেই অনুযায়ী পড়া করতে করতে মডেল উত্তর ও আনিয়ে দেখলেন, যে এখাকার মত গতানুগতিক উত্তর ওরা চায় না। সংক্ষিপ্ত অথচ নিজস্বতা দিয়ে বিশ্লেষণ মূলক উত্তর চায় ওরা।
সীতাংশু স্যার নিজে উত্তর তৈরি করতে শেখালেন নিশিকান্তকে।সত্যিই স্বপ্ন তাদের ঘুমাতে দেয় নি, রাতকে রাত পড়াশোনায় কাবার করে ফেলতো তারা দুজনে।” ভাইভা”র জন্য কথা বলে বলে তৈরি করালেন নিশিকান্তকে।
নিশিকান্ত পরের বছর পরীক্ষা দিল ইউপিএসসি এর। ইন্টারভিউ এর সময় সীতাংশু স্যার নিশিকান্ত কে নিয়ে নিজে দিল্লী গেলেন। রেজাল্ট বেরতেই দেখা গেল, নিশিকান্ত প্রথম চান্সেই, প্রথম দশের মধ্যে। খবরটা সীতাংশু স্যারই এনেছিলেন। সঙ্গে এক হাঁড়ি রসগোল্লা। হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল সে দিন। বৃষ্টি দেখে সীতাংশু স্যার নিশিকান্ত কে টেনে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে নাচতে শুরু করছিল সব ভেদ ভুলে। তাদের দেখে কলেজের আরও ছেলমেয়েরা সব বৃষ্টি তে নাচতে নেমে এসেছিল। অন্যান্য স্যাররাও একে একে নেমে এলেন। প্রিন্সিপাল স্যারও বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন।
এ কলেজ এমন আনন্দ কখনও দেখেনি,এমন ঘটনাও কোনদিন ঘটেনি। সীতাংশু স্যারের আনন্দ সেদিন বোধহয় নিশিকান্তর আনন্দ ছাপিয়ে গিয়েছিল। সমস্ত কলেজটা সেদিন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলো। নিশিকান্তর নয় শুধু সীতাংশু স্যারের স্বপ্নও পূরণ হল অবশেষে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























