০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আওয়ামী লীগে’র নির্বাচনী ইশতেহারে রঙ ঢঙের বায়োস্কোপ

ছবিঃ ফাইল ফটো

জনগণের মনে সাধারণ প্রশ্ন-

আমরা কোথায় যাব?

কার কাছে যাব?

এখন আমাদের কি হবে?


যে কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে জনগণের কাছে তার অঙ্গীকার। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটানা তৃতীয় বারের মত সরকার গঠন করেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বর্তমান সরকার গঠিত হওয়ার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে (সে নির্বাচন যেভাবেই হোক না কেন)। আওয়ামী লীগ আগের চার মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০১৪ এবং ২০১৪-২০১৮, ২০১৮-২০২৩) বিগত জোটসঙ্গীদের নিয়ে সরকার গঠন করলেও এবার এককভাবে সরকার আবারও একতরফা ভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সাথে রাজপথে থেকে আন্দোলন সংগ্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায়, আগামী ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনটিও দেশ-বিদেশে বিতর্কিত হতে যাচ্ছে।

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানোর বিষয়ে উল্লেখ করলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ এর নির্বাচনের মতোই আরেকটি একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসিত থাকা জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আসন্ন নির্বাচনে ভোট বয়কটের বিষয়ে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি, বাংলাদেশে ‘জাল’ নির্বাচন হচ্ছে বলে জানান।


তিনি আরও বলেন, এর একটি ‘পূর্বনির্ধারিত’ ফলাফল রয়েছে। “বাংলাদেশী জনগণের আশা-আকাঙ্খার বিরুদ্ধে হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা তাদের ত্যাগকে ক্ষুন্ন করবে যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে এবং জীবন দিয়েছে।


নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নিজেদের দলের সাথে জোটবদ্ধ “ডামি” বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে নামিয়েছে। গত ১৫ বছরে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া বা জাতীয় সংসদকে আরও কার্যকর করার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।

১৯৯০ সালে স্বৈরশাসনের পতনের পর যখন কোনো বেসরকারি টিভি চ্যানেল ছিল না, তখন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেডিওতে সংসদ অধিবেশনের কার্যক্রমের সরাসরি সম্প্রচার শোনার জন্য মানুষ রাস্তায় ভিড় করত। এমনকি ড্রাইভাররা বিতর্ক শোনার জন্য তাদের গাড়ি থামিয়ে দিত। জাতীয় সংসদের বিতর্কে এখন আর মানুষের আগ্রহ নেই।

আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারে সাম্প্রদায়িকতা, এবং সকল ধরণের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রোধ করার কথা বলেছে। কিন্তু বিগত ১৫ বছরেও কেন এর বাস্তবায়ন হয়নি? কতটুকু হয়েছে? গত এক দশকে মানবাধিকার কমিশন একটি অর্থহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

সবার জন্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানবাধিকার লংঘনের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার কোন প্রয়াস আওয়ামী লীগ সরকার দেখায়নি। গত পনেরো বছরে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে র ্যাব ও এর বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা নজিরবিহীন। এটা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে নাকি আমাকে কলঙ্কিত করেছে তা বিচার করার দায়িত্ব আমি দেশের মানুষের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।


আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই শুধু মাত্র ২০২২ সালেই বাংলাদেশে এক বছরে ১৫৪ সংখ্যালঘুকে হত্যা, ধর্ষণের শিকার ৩৯। বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৫৭২টি পরিবারকে, দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে ৪৪৫টি পরিবারকে৷


সারা বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোট ২২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে ৮৪৯ জনকে, হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৪২৪ জনকে এবং আহত করা হয়েছে ৩৬০ জনকে, নিখোঁজ রয়েছেন ৬২ জন, চাঁদাবাজি হয়েছে ২৭ কোটি ৪৬ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা৷ এ সময়ে সংখ্যালঘুদের মোট ২২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে৷ এ সময় পরিবার ও মন্দির লুট হয়েছে ৩১৯টি, বসতবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮৯১টি, অগ্নিসংযোগ হয়েছে ৫১৯টি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে ১৭৩টি৷

ঘরবাড়ি দখল হয়েছে ৫৭টি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ৫০টি এবং মন্দিরের ভূমি দখল হয়েছে ৫১টি৷ দখলের তৎপরতা ৯৮৪ একর ১২ শতাংশ৷ বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৫৭২টি পরিবারকে৷ উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৪ টি পরিবারকে, উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার ৮১৮টি পরিবারকে৷

২০২২ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩৯ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৭ জন৷ ধর্ষণের পর ১৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে৷ তাতে বলা হয়েছে, ৫৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে, ১৫২ জনকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে৷ ধর্মান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে ৪০ জনকে। এটি শুধু বিগত এই বছরের সমীক্ষা।

আওয়ামী লীগ ইশতেহারে, ব্যাংকসহ, আর্থিক খাতে সমৃদ্ধির কথা বলেছে। কিন্তু সরকার ব্যাংকিং খাতে অর্থ লুটপাট সহ ব্যাপক দুর্নীতির মধ্য দিয়ে দেশের বর্তমান রিজার্ভ তলানিতে নিয়ে এসেছে। কে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনীতিবিদ নাকি সরকারি কর্মচারী, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে চলছে বিতর্ক। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় যে সব আমলাদের সেকেন্ড হোম রয়েছে, তাদের সংখ্যা বেশি।

সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূল করতেও ব্যর্থ হয়েছে। জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকার সফলতা দেখাতে পারেনি। এমনকি সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অনেকে নিহত হলেও পরে এসব ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হয়। এমনকি তারা অপরাধী হলেও, তাদের প্রথমে বিচার করা উচিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ মাদকবিরোধী অভিযানের নামে র‍্যাবের ক্রসফায়ারে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে।

আওয়ামী লীগ ইশতেহারে যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা বলেছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে দৃশ্যত কিছু অবকাঠামো ছাড়া দেশের বিশাল কর্মক্ষম যুবসমাজের জন্য ফলপ্রসু কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।

গত এক দশকে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনুপাতিক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারায় জনসংখ্যার একটি বড় অংশের জন্য এই প্রবৃদ্ধির তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের ইশতেহারেও বলা হয়েছিল, আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ তিন বছরে প্রায় ৮০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতি বছর সাত থেকে আট লাখের বেশি মানুষ চাকরি পায় না। দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশ এখন বেকার। সর্বোপরি সরকারি চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে রাজনৈতিক কারণে চাকরি দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশকে শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেকারত্ব দূর করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে মোট বেকার ের সংখ্যা ১.৮২ মিলিয়ন যেখানে শহুরে এলাকার সংখ্যা ০.৭৭ মিলিয়ন।

কর্মসংস্থানস্থিতিস্থাপকতা, যা একটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার শতাংশ হিসাবে তার জনসংখ্যার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা নির্দেশ করে, ২০০৫-০৬ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে হ্রাস পেয়েছিল।

২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছরের মধ্যে দেশের কর্মসংস্থানস্থিতিস্থাপকতা ছিল ০.৫৫। ২০১০-১১ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে এটি ০.২৫-এ নেমে আসে, যখন অর্থনীতির গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৬ শতাংশ। বাংলাদেশে ৫০ শতাংশেরও বেশি তরুণ, কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ তরুণ রয়েছে।

২০০৮ সালের পরে সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার ছিল ২০০৯ সালে ৫% এবং সর্বনিম্ন বেকারত্বের হার ছিল ২০১০ সালে ৩.৩৮%। ২০১০ সালের পরে, বেকারত্বের হার ২০১৩ সাল পর্যন্ত আবার বৃদ্ধি পায় যখন এটি ছিল ৪.৪৩%। এরপর ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ সালে বেকারত্বের হার ধীরে ধীরে কমছে যথাক্রমে ৪.৩৭%, ৪.২৮% এবং ৪.১৯%। ২০১৬ সালে মোট বেকার সংখ্যা ছিল ২.৭ বিলিয়ন এবং ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ২.৬ বিলিয়ন।


বিগত নির্বাচনে দলটি তাদের ইশতেহারে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কোনও আইনের অপব্যবহার না করার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বাস্তবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো দূরের কথা, সাংবাদিকতা চর্চা করাও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সরকার তথ্য সংগ্রহের যে সামান্য সুযোগ তৈরি করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে তা একাধিকবার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তার স্বার্থে এই আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি মূলত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রতি সরকারের আচরণও উদ্বেগজনক।


বর্তমানে  দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের  বিতর্কিত নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখল করেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংসদীয় গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সবকিছুই অনুপস্থিত। ৭ই জানুয়ারির আসন্ন নির্বাচন নিঃসন্দেহে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট কায়দায় আরেকটি একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

গাজী সাইফুল/এমএফ/পিআর


 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

আওয়ামী লীগে’র নির্বাচনী ইশতেহারে রঙ ঢঙের বায়োস্কোপ

প্রকাশিত : ০৯:০২:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৪

জনগণের মনে সাধারণ প্রশ্ন-

আমরা কোথায় যাব?

কার কাছে যাব?

এখন আমাদের কি হবে?


যে কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে জনগণের কাছে তার অঙ্গীকার। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটানা তৃতীয় বারের মত সরকার গঠন করেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বর্তমান সরকার গঠিত হওয়ার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে (সে নির্বাচন যেভাবেই হোক না কেন)। আওয়ামী লীগ আগের চার মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০১৪ এবং ২০১৪-২০১৮, ২০১৮-২০২৩) বিগত জোটসঙ্গীদের নিয়ে সরকার গঠন করলেও এবার এককভাবে সরকার আবারও একতরফা ভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সাথে রাজপথে থেকে আন্দোলন সংগ্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায়, আগামী ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনটিও দেশ-বিদেশে বিতর্কিত হতে যাচ্ছে।

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানোর বিষয়ে উল্লেখ করলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ এর নির্বাচনের মতোই আরেকটি একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসিত থাকা জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আসন্ন নির্বাচনে ভোট বয়কটের বিষয়ে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি, বাংলাদেশে ‘জাল’ নির্বাচন হচ্ছে বলে জানান।


তিনি আরও বলেন, এর একটি ‘পূর্বনির্ধারিত’ ফলাফল রয়েছে। “বাংলাদেশী জনগণের আশা-আকাঙ্খার বিরুদ্ধে হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা তাদের ত্যাগকে ক্ষুন্ন করবে যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে এবং জীবন দিয়েছে।


নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নিজেদের দলের সাথে জোটবদ্ধ “ডামি” বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে নামিয়েছে। গত ১৫ বছরে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া বা জাতীয় সংসদকে আরও কার্যকর করার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।

১৯৯০ সালে স্বৈরশাসনের পতনের পর যখন কোনো বেসরকারি টিভি চ্যানেল ছিল না, তখন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেডিওতে সংসদ অধিবেশনের কার্যক্রমের সরাসরি সম্প্রচার শোনার জন্য মানুষ রাস্তায় ভিড় করত। এমনকি ড্রাইভাররা বিতর্ক শোনার জন্য তাদের গাড়ি থামিয়ে দিত। জাতীয় সংসদের বিতর্কে এখন আর মানুষের আগ্রহ নেই।

আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারে সাম্প্রদায়িকতা, এবং সকল ধরণের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রোধ করার কথা বলেছে। কিন্তু বিগত ১৫ বছরেও কেন এর বাস্তবায়ন হয়নি? কতটুকু হয়েছে? গত এক দশকে মানবাধিকার কমিশন একটি অর্থহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

সবার জন্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানবাধিকার লংঘনের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার কোন প্রয়াস আওয়ামী লীগ সরকার দেখায়নি। গত পনেরো বছরে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে র ্যাব ও এর বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা নজিরবিহীন। এটা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে নাকি আমাকে কলঙ্কিত করেছে তা বিচার করার দায়িত্ব আমি দেশের মানুষের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।


আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই শুধু মাত্র ২০২২ সালেই বাংলাদেশে এক বছরে ১৫৪ সংখ্যালঘুকে হত্যা, ধর্ষণের শিকার ৩৯। বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৫৭২টি পরিবারকে, দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে ৪৪৫টি পরিবারকে৷


সারা বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোট ২২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে ৮৪৯ জনকে, হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ৪২৪ জনকে এবং আহত করা হয়েছে ৩৬০ জনকে, নিখোঁজ রয়েছেন ৬২ জন, চাঁদাবাজি হয়েছে ২৭ কোটি ৪৬ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা৷ এ সময়ে সংখ্যালঘুদের মোট ২২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে৷ এ সময় পরিবার ও মন্দির লুট হয়েছে ৩১৯টি, বসতবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮৯১টি, অগ্নিসংযোগ হয়েছে ৫১৯টি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে ১৭৩টি৷

ঘরবাড়ি দখল হয়েছে ৫৭টি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ৫০টি এবং মন্দিরের ভূমি দখল হয়েছে ৫১টি৷ দখলের তৎপরতা ৯৮৪ একর ১২ শতাংশ৷ বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৫৭২টি পরিবারকে৷ উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৪ টি পরিবারকে, উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার ৮১৮টি পরিবারকে৷

২০২২ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩৯ জন নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৭ জন৷ ধর্ষণের পর ১৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে৷ তাতে বলা হয়েছে, ৫৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে, ১৫২ জনকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে৷ ধর্মান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে ৪০ জনকে। এটি শুধু বিগত এই বছরের সমীক্ষা।

আওয়ামী লীগ ইশতেহারে, ব্যাংকসহ, আর্থিক খাতে সমৃদ্ধির কথা বলেছে। কিন্তু সরকার ব্যাংকিং খাতে অর্থ লুটপাট সহ ব্যাপক দুর্নীতির মধ্য দিয়ে দেশের বর্তমান রিজার্ভ তলানিতে নিয়ে এসেছে। কে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনীতিবিদ নাকি সরকারি কর্মচারী, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে চলছে বিতর্ক। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় যে সব আমলাদের সেকেন্ড হোম রয়েছে, তাদের সংখ্যা বেশি।

সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূল করতেও ব্যর্থ হয়েছে। জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকার সফলতা দেখাতে পারেনি। এমনকি সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অনেকে নিহত হলেও পরে এসব ব্যক্তি নির্দোষ প্রমাণিত হয়। এমনকি তারা অপরাধী হলেও, তাদের প্রথমে বিচার করা উচিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ মাদকবিরোধী অভিযানের নামে র‍্যাবের ক্রসফায়ারে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে।

আওয়ামী লীগ ইশতেহারে যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা বলেছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে দৃশ্যত কিছু অবকাঠামো ছাড়া দেশের বিশাল কর্মক্ষম যুবসমাজের জন্য ফলপ্রসু কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।

গত এক দশকে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনুপাতিক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারায় জনসংখ্যার একটি বড় অংশের জন্য এই প্রবৃদ্ধির তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের ইশতেহারেও বলা হয়েছিল, আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ তিন বছরে প্রায় ৮০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতি বছর সাত থেকে আট লাখের বেশি মানুষ চাকরি পায় না। দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশ এখন বেকার। সর্বোপরি সরকারি চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে রাজনৈতিক কারণে চাকরি দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশকে শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেকারত্ব দূর করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে মোট বেকার ের সংখ্যা ১.৮২ মিলিয়ন যেখানে শহুরে এলাকার সংখ্যা ০.৭৭ মিলিয়ন।

কর্মসংস্থানস্থিতিস্থাপকতা, যা একটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার শতাংশ হিসাবে তার জনসংখ্যার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা নির্দেশ করে, ২০০৫-০৬ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে হ্রাস পেয়েছিল।

২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছরের মধ্যে দেশের কর্মসংস্থানস্থিতিস্থাপকতা ছিল ০.৫৫। ২০১০-১১ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে এটি ০.২৫-এ নেমে আসে, যখন অর্থনীতির গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৬ শতাংশ। বাংলাদেশে ৫০ শতাংশেরও বেশি তরুণ, কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ তরুণ রয়েছে।

২০০৮ সালের পরে সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার ছিল ২০০৯ সালে ৫% এবং সর্বনিম্ন বেকারত্বের হার ছিল ২০১০ সালে ৩.৩৮%। ২০১০ সালের পরে, বেকারত্বের হার ২০১৩ সাল পর্যন্ত আবার বৃদ্ধি পায় যখন এটি ছিল ৪.৪৩%। এরপর ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ সালে বেকারত্বের হার ধীরে ধীরে কমছে যথাক্রমে ৪.৩৭%, ৪.২৮% এবং ৪.১৯%। ২০১৬ সালে মোট বেকার সংখ্যা ছিল ২.৭ বিলিয়ন এবং ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ২.৬ বিলিয়ন।


বিগত নির্বাচনে দলটি তাদের ইশতেহারে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কোনও আইনের অপব্যবহার না করার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বাস্তবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো দূরের কথা, সাংবাদিকতা চর্চা করাও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সরকার তথ্য সংগ্রহের যে সামান্য সুযোগ তৈরি করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে তা একাধিকবার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তার স্বার্থে এই আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি মূলত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রতি সরকারের আচরণও উদ্বেগজনক।


বর্তমানে  দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের  বিতর্কিত নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখল করেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংসদীয় গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সবকিছুই অনুপস্থিত। ৭ই জানুয়ারির আসন্ন নির্বাচন নিঃসন্দেহে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট কায়দায় আরেকটি একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

গাজী সাইফুল/এমএফ/পিআর