সময়টা ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ। সেনা সমর্থিত জেনারেল মঈন-ফখরুদ্দিন এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার তারেক রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে এক যৌথবাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা দায়ের করা হয়। বিভিন্ন মামলায় ৯ দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত।
রিমান্ডে চোখ বেঁধে ১৮ ঘন্টা ঝুলিয়ে চারপাশ থেকে বুটের লাথি দেয়া হয়েছে। মারা হয়েছে কিল আর ঘুষি। এক পর্যায়ে প্রায় সংঞ্জাহীন অবস্থায় উপর থেকে ফেলে দেয়া হয়। এভাবেই রিমান্ডে জিঞ্জাসাবাদকালে মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান।
তিনি তার আইনজীবীদের সাথে আলোচনাকালে তার উপর নির্যাতনের এই বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। মামলায় হাজিরাকালে বিভিন্ন সময় আদালতেও তিনি তার ওপর নির্যাতনের কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন। তারেক রহমানের আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, তিনি জানিয়েছেন রিমান্ডকালে তাকে অসহ্য অবর্ণনীয় যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে।
সকাল বেলা নাস্তার প্রস্তুতি নেয়ার সময় তাকে রিমান্ডে নেয়ার কথা জানানো হলো। সে সময়টায় তিনি আর নাস্তা মুখে তোলেননি। খালি পেটেই উঠে দাঁড়ান। একটি কালো গ্লাসে ঢাকা গাড়িতে তোলার সময় পেছন থেকে কেউ একজন কালো মোটা কাপড়ে তার চোখ বেঁধে ফেলে। গাড়িতে তোলার পর থেকেই শুরু হয় শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন। এক কারারক্ষী জানান, ওইদিন তাকে চোখ বাঁধার দৃশ্য দেখেই এক অজানা আশঙ্কায় আঁতকে উঠেছিলেন তারা। সে দৃশ্য ছিল অস্বাভাবিক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বড় ছেলে তারেক রহমানের শয্যাপাশে
চোখ বেঁধে ১৮ ঘণ্টা ঝুলিয়ে লিছুক্ষণ পর পর লাথি আর কিল ঘুষি মারা হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকবার সংঞ্জা হারান তিনি। সংঞ্জা ফেরার পর নতুন উদ্যমে চলে নির্যাতন। তারেক রহমান বলেছেন, রিমান্ডের সেই নির্যাতনের কথা মনে হলেই ভয়ে তার গা শিউরে ওঠে। যা বর্ণনা করার ভাষা তার নেই। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি একজন রাজনীতিবিদকে এরকম বর্বরোচিত, লোমহর্ষক কায়দায় নির্যাতন করা হতে পারে। এই সময়ে চারপাশ থেকে বলা হয়েছে, শালা দেশ ধ্বংস করেছে। মার শালারে। তখন তাদের মুখের ভাষা এতই নোংরা হয়েছিল যে, যা ভদ্র ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কখনও বলা হয়েছে নানাভাবে পিটিয়ে আহত করতে।
কখনও বলা হয়েছে মেরে ফেলতে। এ সময়ে তারেক রহমানের চোখ বাঁধা থাকায় কারও মুখ না দেখলেও সর্বক্ষণ একটি কণ্ঠের বিভিন্ন নির্দেশনা শুনেছেন। এক পর্যায়ে প্রায় সংঞ্জাহীন অবস্থায় চোখ বাঁধা অবস্থায় তারেক রহমানকে উপর থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পড়ে যাওয়ার পর আর কিছুই মনে নেই। এইসব ঘটনা বর্ণনা করার সময় তারেক রহমান চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না।
তারেক রহমান আদালতকে বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে সে বিষয়ে আমি ঞ্জাত নই। আমি আজকে বিঞ্জ আদালতের কাছে, মাননীয় আদালতের কাছে আমার দৈহিক নিরাপত্তার দাবী করছি। আদালত একই সঙ্গে আমি যতটুকু জানি, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে, রিমান্ডে যদি নেয়া হয়ে সেখানে আমার আইনঞ্জ থাকবে। অথচ আমাকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। চোখ বেঁধে আমাকে যাচ্ছেতাই ভাবে জিঞ্জাসাবাদ করা হয়েছে।
মাননীয় আদালত, আমি চোখ বাঁধা অবস্থায় রিমান্ডে তখন কাদের সঙ্গে কথা বলেছি তা মোটেই ঞ্জাত নই। আপনার প্রতি আমার অনুরোধ মাননীয় আদালত, আমাকে এ নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করবেন। এ নির্যাতনের হাত থেকে আমি আপনার কাছে নিরাপত্তা চাইছি।
এ শারীরিক লাঞ্চনার হাত থেকে, গত ৩১ শে ডিসেম্বর রাতে যে ঝড় আমার ওপর দিয়ে গেছে, তার হাত থেকে আমি আপনার কাছে নিরাপত্তা চাই।
মাননীয় আদালত আমাকে ক্ষমা করবেন। সেদিন ওখান থেকে বেরিয়ে আসার পরে যখন কারাগারে পাঠানো হল, তখন থেকে মাননীয় আদালত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকা আমার জন্য কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসার জন্য মাননীয় আদালত নির্দেশ দিলেও তা মানা হয়নি। মাননীয় আদালত আমি চিকিৎসা চাই। আমি বাঁচতে চাই। আমাকে আর রিমান্ডে দিবেন না। মাননীয় আদালত, এভাবে যদি একজন রাজনীতিবিদকে নির্যাতন করা হয়, তাহলে আমার মনে হয়, একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে একটা মানুষের পক্ষে এ নির্যাতনে সহ্য করা অত্যন্ত কষ্টকর। কি করম কষ্টকর মাননীয় আদালতকে আমি তা বুঝিয়ে বলতে পারবো না। মাননীয় আদালত আমি ছবিতে এসব দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু মানুষকে আসলেই এভাবে অন্যায় ও অত্যাচার করা হয় তা নিজেই সহ্য করলাম। অনুভব করলাম।
এরপর ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। একই বছরের ৩১ জানুয়ারি নানি বেগম তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যুতে তারেক রহমান মাত্র ৩ ঘন্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলো। দীর্ঘ ১৮ মাস কারাবন্দি থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সব মামলায় জামিনে মুক্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান।