০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

ঈদ কার্ডঃ হারিয়ে যাওয়া এক সোনালি অনুভব

ফাইল ছবি


এক সময় ঈদ মানেই ছিল ডাকপিয়নের কাঁধে দুলতে থাকা ব্যাগভর্তি ভালোবাসা, স্টেশনারির দোকানে রঙিন কার্ডের ভিড়, আর হৃদয়ের গভীর থেকে লেখা শুভেচ্ছাবার্তার উষ্ণতা। প্রযুক্তির ছোঁয়া তখনও এতোটা প্রবল ছিল না—ছিল হাতের লেখায় হৃদয়ের স্পর্শ, কার্ডের ক্যানভাসে মনের ভাষা। ঈদের আগমন মানেই ছিল প্রিয়জনকে মনে করবার আর জানাবার অনন্য এক উপলক্ষ।

নব্বইয়ের দশকে ঈদ কার্ডের ছিল রাজত্বকাল। ফুটপাথের অস্থায়ী স্টল থেকে শুরু করে নামী বইয়ের দোকান—সবখানেই চোখে পড়ত কার্ড কেনার উৎসব। স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীরা ঈদের আগে টাকা জমাত শুধু বন্ধুর জন্য কার্ড কিনবে বলে। আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা গোপন ভালোবাসার মানুষটির জন্য বেছে নেওয়া হতো ভিন্ন ভিন্ন কার্ড। কার্ডে লেখা হতো সযত্নে সাজানো বাক্য, কখনো হয়তো নিজ হাতে আঁকা নকশা বা কবিতার পংক্তি।

ঈদ কার্ডের ডিজাইনেও ছিল এক অপার বৈচিত্র্য। কেউ ভালোবাসত ইসলামিক মোটিফ—মসজিদের মিনার, চাঁদ-তারা, আরবি ক্যালিগ্রাফির পবিত্র ছোঁয়া। কেউ আবার হাত বাড়াত প্রকৃতির রঙে আঁকা কার্ডের দিকে—ফুল, পাখি কিংবা হাসিমুখের কার্টুন চরিত্রে ভরা কোনো কার্ডে। এমনকি জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিকদের উক্তি সম্বলিত কার্ডও ছিল তরুণদের ভীষণ পছন্দের।

কিন্তু সময় তো চলে আপন গতিতে। কাগজের সেই কার্ডকে আজ সরিয়ে দিয়েছে স্ক্রিনের ঝলক। ফেসবুক পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ কিংবা এক ক্লিকে পাঠানো ডিজিটাল ই-কার্ডেই সীমাবদ্ধ আজ ঈদের শুভেচ্ছা। ডাকপিয়নের কাঁধের ব্যাগ আজ হালকা, স্টেশনারি দোকানে কার্ডের বদলে জায়গা নিয়েছে গ্যাজেট আর গিফট আইটেম।

আজকের তরুণদের অনেকেই জানেই না ঈদ কার্ড কেনা, লেখা আর ডাকপিয়নের অপেক্ষার আনন্দ কেমন ছিল। তবে সব আলো নিভে যায়নি। এখনো কেউ কেউ নিজেদের হাতে কার্ড তৈরি করেন, কেউ পুরনো সেই রেওয়াজ ধরে রাখেন নীরবে, নিভৃতে। কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো কাস্টমাইজড কার্ড বানায়, যদিও বাণিজ্যিকভাবে তার কদর আগের মতো নেই।

হয়তো হাতে লেখা ঈদ কার্ডের সেই সোনালি দিন আর ফিরে আসবে না, কিন্তু একটিবার চেষ্টায় ফিরিয়ে আনা যায় সেই পুরনো উষ্ণতা। একটি হাতে লেখা কার্ডের মাঝে যে ভালোবাসা গাঁথা থাকে, তা কি কখনো একটি ডিজিটাল মেসেজে ধরা দেয়? প্রযুক্তি এগিয়ে গেলেও কিছু অনুভব, কিছু স্মৃতি সবসময় অমূল্যই থেকে যায়।

ঈদের আনন্দের মাঝে যদি কেউ একটি হাতে লেখা কার্ড হাতে পায়, তবে হয়তো তার ঈদ হয়ে ওঠে আরও একটু বেশি নিজের, আরও একটু বেশি কাছের। আর এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকবে হারিয়ে যাওয়া ঈদ কার্ডের সেই অমলিন ঐতিহ্য—স্মৃতির পাতায়, ভালোবাসার গভীরে।

জনপ্রিয়

ঈদ কার্ডঃ হারিয়ে যাওয়া এক সোনালি অনুভব

প্রকাশিত : ০৪:৪৪:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ মে ২০২৫

এক সময় ঈদ মানেই ছিল ডাকপিয়নের কাঁধে দুলতে থাকা ব্যাগভর্তি ভালোবাসা, স্টেশনারির দোকানে রঙিন কার্ডের ভিড়, আর হৃদয়ের গভীর থেকে লেখা শুভেচ্ছাবার্তার উষ্ণতা। প্রযুক্তির ছোঁয়া তখনও এতোটা প্রবল ছিল না—ছিল হাতের লেখায় হৃদয়ের স্পর্শ, কার্ডের ক্যানভাসে মনের ভাষা। ঈদের আগমন মানেই ছিল প্রিয়জনকে মনে করবার আর জানাবার অনন্য এক উপলক্ষ।

নব্বইয়ের দশকে ঈদ কার্ডের ছিল রাজত্বকাল। ফুটপাথের অস্থায়ী স্টল থেকে শুরু করে নামী বইয়ের দোকান—সবখানেই চোখে পড়ত কার্ড কেনার উৎসব। স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীরা ঈদের আগে টাকা জমাত শুধু বন্ধুর জন্য কার্ড কিনবে বলে। আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা গোপন ভালোবাসার মানুষটির জন্য বেছে নেওয়া হতো ভিন্ন ভিন্ন কার্ড। কার্ডে লেখা হতো সযত্নে সাজানো বাক্য, কখনো হয়তো নিজ হাতে আঁকা নকশা বা কবিতার পংক্তি।

ঈদ কার্ডের ডিজাইনেও ছিল এক অপার বৈচিত্র্য। কেউ ভালোবাসত ইসলামিক মোটিফ—মসজিদের মিনার, চাঁদ-তারা, আরবি ক্যালিগ্রাফির পবিত্র ছোঁয়া। কেউ আবার হাত বাড়াত প্রকৃতির রঙে আঁকা কার্ডের দিকে—ফুল, পাখি কিংবা হাসিমুখের কার্টুন চরিত্রে ভরা কোনো কার্ডে। এমনকি জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিকদের উক্তি সম্বলিত কার্ডও ছিল তরুণদের ভীষণ পছন্দের।

কিন্তু সময় তো চলে আপন গতিতে। কাগজের সেই কার্ডকে আজ সরিয়ে দিয়েছে স্ক্রিনের ঝলক। ফেসবুক পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ কিংবা এক ক্লিকে পাঠানো ডিজিটাল ই-কার্ডেই সীমাবদ্ধ আজ ঈদের শুভেচ্ছা। ডাকপিয়নের কাঁধের ব্যাগ আজ হালকা, স্টেশনারি দোকানে কার্ডের বদলে জায়গা নিয়েছে গ্যাজেট আর গিফট আইটেম।

আজকের তরুণদের অনেকেই জানেই না ঈদ কার্ড কেনা, লেখা আর ডাকপিয়নের অপেক্ষার আনন্দ কেমন ছিল। তবে সব আলো নিভে যায়নি। এখনো কেউ কেউ নিজেদের হাতে কার্ড তৈরি করেন, কেউ পুরনো সেই রেওয়াজ ধরে রাখেন নীরবে, নিভৃতে। কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো কাস্টমাইজড কার্ড বানায়, যদিও বাণিজ্যিকভাবে তার কদর আগের মতো নেই।

হয়তো হাতে লেখা ঈদ কার্ডের সেই সোনালি দিন আর ফিরে আসবে না, কিন্তু একটিবার চেষ্টায় ফিরিয়ে আনা যায় সেই পুরনো উষ্ণতা। একটি হাতে লেখা কার্ডের মাঝে যে ভালোবাসা গাঁথা থাকে, তা কি কখনো একটি ডিজিটাল মেসেজে ধরা দেয়? প্রযুক্তি এগিয়ে গেলেও কিছু অনুভব, কিছু স্মৃতি সবসময় অমূল্যই থেকে যায়।

ঈদের আনন্দের মাঝে যদি কেউ একটি হাতে লেখা কার্ড হাতে পায়, তবে হয়তো তার ঈদ হয়ে ওঠে আরও একটু বেশি নিজের, আরও একটু বেশি কাছের। আর এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকবে হারিয়ে যাওয়া ঈদ কার্ডের সেই অমলিন ঐতিহ্য—স্মৃতির পাতায়, ভালোবাসার গভীরে।