শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা প্রকৃত অর্থে জাতি গঠনের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন বাংলাদেশের নির্মাণে এটিকে একটি অর্থবহ উপায়ে রূপান্তরিত করার জন্য শিক্ষা সংস্কার এখনই জরুরি।
প্রথমে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আগে বাংলাদেশের শিক্ষা বিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যাবশ্যক। গত এক হাজার বছরে বিভিন্ন ধাপে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে। মুসলিম শাসনামলে একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। যদিও তা আধুনিক শিক্ষার মতো ছিল না, তবুও তখনকার প্রয়োজন মেটাতে তা যথেষ্ট ছিল।
ব্রিটিশরা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে, যার ফলে আমরা বর্তমান ব্যবস্থাটি পেয়েছি। এটি আধুনিক সময়ের চাহিদা পূরণে বেশ কার্যকর ছিল, যদিও তাতে অনেক ত্রুটি ছিল। পাকিস্তান সরকার হামিদুর রহমান কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, কিন্তু জনগণের ব্যাপক প্রতিবাদের কারণে তা সফল হয়নি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছিল। ড. কুদরতি খুদা কমিশন ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে। এরশাদ আমলে ড. মাজিদ কমিশন শিক্ষায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি আনার চেষ্টা করে, কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং তাদের ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতার উপর জোর দেওয়া হয়। বিশেষ করে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে শিক্ষার সকল স্তরে মুজিববাদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনোভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লব একটি নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে, যেখানে নতুন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা সংস্কার কার্যকর করার পথ খুলে গেছে। সময় নষ্ট না করে সরকারকে এখনই একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে। এই কমিশনের কাজ হবে বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি এমন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, যা নতুন বাংলাদেশের নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নতুন শিক্ষানীতির মূল দিকনির্দেশনা:
১. সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তি:
শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
২. ধর্মীয় শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি:
– মুসলিম ছাত্রদের জন্য প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আরবি এবং ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। ইংরেজি মাধ্যমেও এটি অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।
– অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের নিজ নিজ ধর্মের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা উচিত।
– ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং আরবি ভাষা ঐচ্ছিক রাখা যেতে পারে।
৩. বিভাগীয় শিক্ষা:
– ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা তিনটি ধারায় বিভক্ত হতে পারে: ইসলামিক, সাধারণ, এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।
– উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে মানবিক, ব্যবসায় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এই তিনটি বিভাগ থাকতে পারে।
৪. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানদণ্ড:
– শুধুমাত্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা উন্মুক্ত রাখা উচিত।
– বাকি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষায় উৎসাহিত করা উচিত।
– ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা পৃথক সত্তা হিসেবে বজায় রাখা প্রয়োজন।
৫. প্রতিটি স্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ:
– প্রাথমিক শিক্ষা: চরিত্র গঠন এবং ভিত্তি তৈরি।
– মাধ্যমিক শিক্ষা: দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়ে জোর।
– উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা: উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর দক্ষতা তৈরি।
– বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা: গবেষণা এবং পেশা ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন।
শিক্ষাব্যবস্থাকে আমাদের সামাজিক-ধর্মীয় অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সময় এবং অর্থ অপচয় না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এখন না হলে আর কখনোই নয়।
সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল এবং আইন ও ইতিহাসের অধ্যাপক।
প্রফেসর ড. এস কে আকরাম আলী 
























