০৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের পরই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন গার্মেন্টস কর্মী সুমি, পরে মৃত্যু

আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় সুমি আক্তার ওরফে মিশু (২৭) নামের এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর ঠিক আগে কারখানার এক কর্মকর্তাকে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দেখা যায়।

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ওই কর্মকর্তা সুমির মেশিনে চাপড় মারছেন এবং একপর্যায়ে তাঁর হাত থেকে কাপড় কেড়ে নিয়ে ফেলে দিচ্ছেন। এর পরপরই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন সুমি।

গত শুক্রবার বিকেলে ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে এ ঘটনা ঘটে। সুমি ওই কারখানার সুইং অপারেটর ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, অসুস্থ বোধ করলেও তিনি ছুটি পাননি। তাঁকে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়। মৃত্যুর আগে এক কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের শিকার হন তিনি।

সুমির বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায়। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ১ মিনিটে নিজের মেশিনে কাজ করছিলেন সুমি। কিছুক্ষণ পর এক কর্মকর্তা তাঁর কাছে এসে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলতে থাকেন। এ সময় ওই কর্মকর্তাকে সুমির মেশিনে কয়েকবার চাপড় মারতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি সুমির হাত থেকে কাপড় কেড়ে নিয়ে ফেলে দেন।

এরপরই মেঝেতে পড়ে যান সুমি। কর্মকর্তা তখন কিছুটা দূরে সরে যান। পরে সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, সুমির স্বজন ও সহকর্মীদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে গিয়েছিলেন সুমি। দুপুরে বাসায় খাবার খেতে গিয়ে ছেলেকে শরীর খারাপ লাগার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। ছুটি না পেয়ে খাবার খেয়ে আবার কারখানায় ফিরে যান।

মিন্টুর অভিযোগ, বিকেল ৫টায় ছুটি হওয়ার কথা থাকলেও সুমিকে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছিল। কর্মকর্তার মানসিক নির্যাতনের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

স্বামীর অভিযোগ, কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন সুমি

সুমির স্বামী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, মৃত্যুর আগে কারখানার এক কর্মকর্তা তাঁর স্ত্রীকে বকাঝকা ও মানসিক নির্যাতন করছিলেন। সেই সময়ই সুমি মারা যান।

সাজ্জাদ জানান, প্রথমে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্ত্রীর মরদেহ দাফন করতে চেয়েছিলেন। পরে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করেন। শুক্রবার রাতে আশুলিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর মরদেহ ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে নেওয়া হয়।

নারী ও শিশু হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হারুন-অর-রশীদ বলেন, সুমিকে নিথর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

সুমির ছুটি চাওয়া ও কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে জানতে চাইলে আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা হাসান বলেন, ছুটির আগমুহূর্তে মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যান সুমি। সহকর্মীরা তাঁকে দ্রুত নারী ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

সুমি অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটি চেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে হাসান বলেন, শ্রমিকেরা অসুস্থতার কথা জানালে তাঁদের ছুটি দেওয়া হয়। তবে সুমি কর্তৃপক্ষকে অসুস্থতার কথা জানাননি বলে দাবি করেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজে ওই কর্মকর্তার আচরণের বিষয়ে ডেকো গ্রুপের মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া এবং সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম শাহাদাত হোসেন কিরণের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

ওসি আরও বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে মৃত্যুর আগে এক কর্মকর্তাকে ওই নারী শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে দেখা গেছে। ওই কর্মকর্তার নামও পুলিশ জেনেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তাঁর নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।

সুমির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের পরই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন গার্মেন্টস কর্মী সুমি, পরে মৃত্যু

প্রকাশিত : ১০:১০:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় সুমি আক্তার ওরফে মিশু (২৭) নামের এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর ঠিক আগে কারখানার এক কর্মকর্তাকে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দেখা যায়।

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ওই কর্মকর্তা সুমির মেশিনে চাপড় মারছেন এবং একপর্যায়ে তাঁর হাত থেকে কাপড় কেড়ে নিয়ে ফেলে দিচ্ছেন। এর পরপরই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন সুমি।

গত শুক্রবার বিকেলে ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে এ ঘটনা ঘটে। সুমি ওই কারখানার সুইং অপারেটর ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, অসুস্থ বোধ করলেও তিনি ছুটি পাননি। তাঁকে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়। মৃত্যুর আগে এক কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের শিকার হন তিনি।

সুমির বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায়। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ১ মিনিটে নিজের মেশিনে কাজ করছিলেন সুমি। কিছুক্ষণ পর এক কর্মকর্তা তাঁর কাছে এসে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলতে থাকেন। এ সময় ওই কর্মকর্তাকে সুমির মেশিনে কয়েকবার চাপড় মারতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি সুমির হাত থেকে কাপড় কেড়ে নিয়ে ফেলে দেন।

এরপরই মেঝেতে পড়ে যান সুমি। কর্মকর্তা তখন কিছুটা দূরে সরে যান। পরে সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, সুমির স্বজন ও সহকর্মীদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে গিয়েছিলেন সুমি। দুপুরে বাসায় খাবার খেতে গিয়ে ছেলেকে শরীর খারাপ লাগার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। ছুটি না পেয়ে খাবার খেয়ে আবার কারখানায় ফিরে যান।

মিন্টুর অভিযোগ, বিকেল ৫টায় ছুটি হওয়ার কথা থাকলেও সুমিকে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছিল। কর্মকর্তার মানসিক নির্যাতনের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

স্বামীর অভিযোগ, কর্মকর্তার দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন সুমি

সুমির স্বামী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, মৃত্যুর আগে কারখানার এক কর্মকর্তা তাঁর স্ত্রীকে বকাঝকা ও মানসিক নির্যাতন করছিলেন। সেই সময়ই সুমি মারা যান।

সাজ্জাদ জানান, প্রথমে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্ত্রীর মরদেহ দাফন করতে চেয়েছিলেন। পরে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করেন। শুক্রবার রাতে আশুলিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর মরদেহ ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে নেওয়া হয়।

নারী ও শিশু হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হারুন-অর-রশীদ বলেন, সুমিকে নিথর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

সুমির ছুটি চাওয়া ও কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে জানতে চাইলে আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা হাসান বলেন, ছুটির আগমুহূর্তে মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যান সুমি। সহকর্মীরা তাঁকে দ্রুত নারী ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

সুমি অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটি চেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে হাসান বলেন, শ্রমিকেরা অসুস্থতার কথা জানালে তাঁদের ছুটি দেওয়া হয়। তবে সুমি কর্তৃপক্ষকে অসুস্থতার কথা জানাননি বলে দাবি করেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজে ওই কর্মকর্তার আচরণের বিষয়ে ডেকো গ্রুপের মানবসম্পদ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া এবং সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম শাহাদাত হোসেন কিরণের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

ওসি আরও বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে মৃত্যুর আগে এক কর্মকর্তাকে ওই নারী শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে দেখা গেছে। ওই কর্মকর্তার নামও পুলিশ জেনেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তাঁর নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।

সুমির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।