জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদকে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকা উত্তরা থেকে ধরে নিয়ে গুম করা হয়েছিল। ৬৩ দিন গুম করে ভারতের শিলংয়ে তাঁকে ছেড়ে দিয়ে আটক দেখায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। আটকের পর সেখানকার একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে। এর পরদিন তাকে শিলং সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা দিয়ে আটক রাখা হয়েছিল। ২০১৮ সালের ২৬শে অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত এক রায়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেয়। ভারত সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের দায়ের করা আপিল নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ ৪ বছর লেগেছে।
সালাউদ্দিন নিখোঁজের দুইদিন আগে ৮ মার্চ তার দুইজন ড্রাইভার ও একজন ব্যক্তিগত সহকারির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের উঠিয়ে নেয়। এ তিনজন দুইদিন র্যাব হেফাজতেই ছিলেন। ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য বাদ দিলেও আদালতে পুলিশের জমা দেয়া কাগজপত্রেই দেখা যাচ্ছে এদের উঠিয়ে নেয়া সাথে র্যাব জড়িত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া বর্ণনা মতে, একইদিন (৮ মার্চ) সকালে সালাউদ্দিনকে খুঁজতে গুলশান-১ এর ১৩৬ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে র্যাব অভিযান চালায়। ধারণা করা যায়, এর আগে আটক তিন কর্মচারির দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সেখানে অভিযান চালানো হয়। র্যাবের কর্মকর্তারা ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি করেন যেখানে কয়েকদিন আগেও সালাউদ্দিন অবস্থান করছিলেন। তবে ওই সময় ফ্ল্যাটে ৭০ বছর বয়স্ক একজন বাবুর্চি ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি। বৃদ্ধ বাবুর্চিকেও র্যাব আটক করে নিয়ে যায়।
গুলশানের ওই ভবনটির মালিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের পরিচালক শহীদুল আলমের। শহীদুল একই ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল আলমের ভাই। ব্যাংকের ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ গুলশানের ১৩৬ নম্বর সড়কের কাছাকাছি যে ভবনে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত সেটির মালিক হচ্ছেন সালাহ উদ্দিন আহমেদ। একই দিন (৮ মার্চ) সকালে ব্যাংক ভবনেও সালাহ উদ্দিনের খোঁজে র্যাব অভিযান চালায়। তাদের ধারণা ছিল ভবনের ৭ম তলায় তিনি লুকিয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখানে ছিলেন না।
অভিযান চালিয়ে চলে যাওয়ার পরে একইদিন আবারও ব্যাংকে গিয়ে র্যাবের এক কর্মকর্তা সেখানকার সিসিটিভির ফুটেজগুলো নিয়ে আসেন। তবে এটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে, সালাহ উদ্দিনের অবস্থানের প্রমাণ খুঁজতে, নাকি নিজেদের অভিযানের প্রমাণ মুছে ফেলতে ফুটেজ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযান চলার সময় সালাহ উদ্দিন উত্তরায় একটি ফ্ল্যাটে অবস্থান করছিলেন যেটির মালিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিব হাসনাত। অর্থাৎ, ব্যাংকটির ডিরেক্টর শহীদুল ইসলামের গুলশানের বাসা থেকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের উত্তরার বাসায় স্থানান্তরিত হয়েছিলেন তিনি।
১০ মার্চ রাতে উত্তরা যে ফ্ল্যাটে সালাহ উদ্দিন ছিলেন সেখানে কিছু লোকের আগমন ঘটে। বিভিন্ন পত্রিকা এবং অন্যান্য গণমাধ্যমকে দেয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে (ওইসব সাক্ষাৎকারের ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড রয়েছে) ওই ভবনের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, আগন্তুকরা নিজেদেরকে ডিবির (ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বাড়িতে ঢুকে সালাহ উদ্দিনের চোখ বেধে নিয়ে বের হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা এবং অন্যান্য ভবনের দারোয়ানরাও নিশ্চিত করেন যে, ওই রাতে সে বাড়ির সামনে এবং রাস্তায় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা এবং তাদের একাধিক গাড়ি অবস্থান নিয়েছিল। স্থানীয় ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, ১০ মার্চ রাতে র্যাবের লোকজন ১৩/বি নম্বর সড়কের অবস্থান কোথায় তা তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। সালাউদ্দিনের অবস্থান করা বাড়িটি এই সড়কেই অবস্থিত।
সালাউদ্দিনকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম, পরিচালক শহীদুল ইসলাম এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিব হাসনাত দেশ ত্যাগ করেন। ২০১৫ সালের ১০ই মার্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে বাড়ি থেকে তুলি নিয়ে গুম করেছিল। গুমের এ ঘটনার সাথে র্যাবের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট।
১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এপিএস ছিলেন। এরপর প্রশাসনের চাকরি ছেড়ে তিনি রাজনীতিতে আসেন। ২০০১ সালে তিনি কক্সবাজার থেকে এমপি নির্বাচিত হন। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হন।
ভারতে আটকের সময় সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। ভারতে আটক অবস্থায় বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















